যুদ্ধ বিগ্রহের দেশ আফগানিস্তান। কখনও স্থিরতা, শান্তি, নিশ্চয়তা ছিল না পশতুনদের দেশ ‘আফগানিস্তানে’। তবে, ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে দাঁড়িয়েও যেদেশটি এত প্রতিকুলতার মধ্যেও এখনো বহাল তবিয়তে টিকে আছে, যেটিকে বলা হয় পরাশক্তিদের ‘গোরস্থান’ সেদেশটি হলো আফগানিস্তান।
ধারাবাহিকভাবে আফগানিস্তানে যুদ্ধের কথা বলতে গেলে, ১ম ব্রিটিশ আফগান যুদ্ধ (১৮৩৯-১৮৪২), ২য় ব্রিটিশ আফগান যুদ্ধ(১৮৭৮-১৮৮০) এর কথা বলতে হয়। প্রথম যুদ্ধে ব্রিটিশরা হেরে যায়, আফগানরা জিতে যায়। আর, দ্বিতীয় যুদ্ধটিতে আফগানরা হেরে যায়, ব্রিটিশরা জিতে যায়। কিন্তু, এ যুদ্ধে পুরোপুরি ক্ষমতা হারায় নি আফগান সরকার। দেশের আভ্যন্তরীণ শাসনকার্য দেখত আফগানি সরকার আর বৈদেশিক সম্পর্ক দেখত ব্রিটিশ সরকার।
এরপর, কয়েক যুগ যুদ্ধবিগ্রহ ছাড়া কাটানোর পর, ১৯৭৯ সালে সোভিয়েত ইউনিয়নের যুদ্ধ বাঁধে আফগানি মুজাহিদীনের সাথে। সে যুদ্ধ ১০ বছর স্থায়ী ছিল। কিন্তু, এ যুদ্ধে সোভিয়েত ইউনিয়ন শোচনীয় ভাবে পরাজয় বরণ করে।
এরপর, আফগানিস্তানে বিভিন্ন গোত্রের সংঘাতে গৃহযুদ্ধ বাঁধে যা পরপর তিনবার সংগঠিত হয়। প্রথম গৃহযুদ্ধ ১৯৮৯-১৯৯২ সাল, দ্বিতীয় গৃহযুদ্ধ ১৯৯২-১৯৯৬ সাল ও তৃতীয় গৃহযুদ্ধ ১৯৯৬-২০০১ পর্যন্ত স্থায়ী হয়েছে।
এই গৃহযুদ্ধ শেষ হতে না হতেই, আমেরিকা আফগানিস্তানকে আক্রমণ করে ২০০১ সালে যা এ বছর সেপ্টেম্বরে মার্কিন সেনা প্রত্যাহারের মাধ্যমে শেষ হবার জন্যে চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছে!
সর্বপ্রথম সোভিয়েত ইউনিয়নের সাথে আফগানিস্তানের যুদ্ধের ইতিহাস দেখা যাক।
প্রাগৈতিহাসিক কাল থেকেই আফগানিস্তান তার পার্শ্ববর্তী সাম্রাজ্যগুলোর আক্রমণের লক্ষ্যবস্তু ছিল। তার একটাই কারন, আফগানিস্তানের ভৌগলিক অবস্থান। চীনা সাম্রাজ্য, পারস্য সাম্রাজ্য, ব্রিটিশ-ভারত সাম্রাজ্য,রাশিয়া সাম্রাজ্যের ঠিক মাঝখানে অবস্থিত ছিল এই আফগানিস্তান। কিন্তু, কেউ কখনও এ ভূমি দখল করতে পারে নি। কারন হিসেবে বলা যায়, আবারো আফগানিস্তানের ভূপ্রকৃতি।শুষ্ক পাথুরে পাহাড়ি মরুভূমির এলাকা এই আফগানিস্তান। যার, পাহাড়ের পাদদেশ থেকে গেরিলা যুদ্ধ করতে পারে মুজাহিদীনরা, যা কোনো পরাশক্তি পারে না! কারন, সাধারণত বহিঃশক্তি সবসময় সমতল ভূমি দখল করে কিন্তু কোনো পাহাড়ি এলাকা দখল করতে পারে না!
আফগানিস্তানে গোত্রীয় কোন্দল বেশি হওয়ার কারনে ঐদেশে একক জাতিসত্ত্বার বিকাশ ঘটে নি। পশতুন, তাজিক, উজবেক সহ নানান জাতের মানুষের বসবাস সেই সাথে আছে ধর্মীয় ভেদাভেদ বা মাযহাবের পার্থক্য যার জন্যে, আফগান জাতি কখনও এক হতে পারে নি। তাই, গোত্রগুলোর মধ্যে সবসময় একটা না একটা কোন্দল লেগেই থাকত।
সোভিয়েত-আফগান যুদ্ধ শুরু হয় ১৯৭৯ সালের ২৪ ডিসেম্বর যা প্রায় ১০ বছর ধরে চলে। ১৯৮৯ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারী শেষ হয় এ যুদ্ধ। এ যুদ্ধে প্রায় ছয় থেকে পনের লক্ষ আফগান নাগরিক প্রাণ হারায়।
আফগানিস্তানে রাজতন্ত্র কায়েম ছিল। ১৯২৯ সালে নাদির শাহ ক্ষমতায় আসেন, তিনি ১৯৩৩ সাল পর্যন্ত ক্ষমতায় ছিলেন। তারপরে, তার পূত্র মোঃ জহির শাহ ক্ষমতায় আসেন ১৯৩৩-১৯৭৩ সাল পর্যন্ত তিনি ক্ষমতায় ছিলেন। জহির শাহই, আফগানিস্তানের সংবিধানে লয়া জিরগার ব্যবস্থা করেন। কিন্তু, জহির শাহকে তার চাচাতো ভাই দাউদ খান ক্ষমতা থেকে সরিয়ে দেন। সেসময় দাউদ খান ছিলেন প্রধানমন্ত্রী আর জহির শাহ বাদশা!এবং, তিনিই প্রথম আফগানিস্তানকে প্রজাতন্ত্র ঘোষণা করে রাজতন্ত্র বিলুপ্ত করেন। এবং, ১৯৭৮ সাল পর্যন্ত তিনি প্রেসিডেন্ট হিসেবে ক্ষমতায় ছিলেন।
এরপর, নানান নাটকীয়তার মধ্যে ক্ষমতায় আসেন বাম ঘরাণার পিপলস ডেমোক্রেটিক পার্টি অফ আফগানিস্তান সংক্ষপে পিডিপিএ। এ দলের দুটি উপদল ছিল- একটি ছিল খালক অংশ, অপরটি পারচাম অংশ। দাউদ খানকে হটিয়ে দিয়ে, পিডিপিএর খালক অংশের নুর মোহাম্মদ তারাকি ক্ষমতায় আসেন (১৯৭৮-১৯৭৯)। কিন্তু, তারাকীকে ১৯৭৯ সালে হত্যা করে প্রেসিডেন্ট হন একই উপদলের হাফিজুল্লাহ আমিন। এই হত্যাকাণ্ডের পর, রাশিয়া পারচাম অংশের বারবাক কারমালকে (১৯৭৯-১৯৮৬) ক্ষমতায় বসায়। এরপর, মোঃ নাজিবুল্লাহকে ক্ষমতায় বসায়(১৯৮৭)। এবং, নাজিবুল্লাহ পরে ক্ষমতায় আরোহন করে, হোমল্যান্ড পার্টি নামে নতুন দল গঠন করেন।
পিডিপিএ-শাসনকালে প্রথম ১৮ মাসে আফগান সরকার সোভিয়েত ইউনিয়নের অণুকরণে একটি আধুনিকায়ন ও সংস্কার কর্মসূচি গ্রহণ করে, যেগুলোর বেশিরভাগই আফগান রক্ষনশীলরা ইসলাম বিরোধী হিসেবে বিবেচনা করেন। বিবাহ প্রথার পরিবর্তন এবং ভূমি সংক্রান্ত অধ্যাদেশগুলো কট্টর ইসলামপন্থী আফগান জনসাধারণের মধ্যে জনপ্রিয়তা অর্জন করতে পারে নি। যার ফলে, তারাকি সরকারের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ দাঁনা বাঁধতে থাকে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে। একদিকে, সরকার হয়েছিল জনরোষের শিকার, অন্যদিকে তারাকি-হাফিজুল্লা আমিনের সম্পর্কে ভাঙ্গন ধরে।
১৯৭৮ সালের এপ্রিলে বিপ্লবের পর হাফিজুল্লাহ আমিন ও তারাকির মধ্যে সম্পর্ক ঘনিষ্ঠ ছিল। পরবর্তীতে তারাকি আমিনের পরামর্শ উপেক্ষা করতে থাকেন। ফলে, দুজনের মধ্যে ক্ষমতার দ্বন্দ শুরু হয়। ফলশ্রুতিতে, তারাকি আমিনের ক্ষমতা লোপ করেন। এসময়, জোট নিরপেক্ষ আন্দোলনের সম্মেলনে অংশ নেয়ার জন্যে কিউবা সফরের সময় গোয়েন্দা সংবাদ থেকে আমিন জানতে পারেন যে তারাকি তাকে হত্যা করার নির্দেশ দিয়েছেন। রুশ দূতাবাস থেকে তাকে সতর্ক করা হলে তিনি প্রাণে বেঁচে যান।
এদিকে, ১৯৭৮ সালের মাঝামাঝি সময়ে সরকারের বিরুদ্ধে একটি বিদ্রোহ শুরু হয়।পূর্ব আফগানিস্তানের নূরিস্তান প্রদেশে বিদ্রোহীরা স্থানীয় সেনানিবাস আক্রমণ করে এবং শীঘ্রই সমগ্র দেশজুড়ে গৃহযুদ্ধ ছড়িয়ে পড়ে। এদিকে, আমিনের ক্ষমতা হ্রাস করার জন্যে তারাকি তাকে রাষ্ট্রদূত হিসেবে বিদেশে প্রেরণ করতে চেয়েছিলেন, কিন্তু আমিন সে প্রস্তাব ফিরিয়ে দেন। এরপুর, তারাকি আমিন সহ তার ঘনিষ্ঠ চার সেনা অফিসারকে কাবুল রাষ্ট্রপতি প্রাসাদে দুপুরের আয়োজনের নিমন্ত্রণ জানান। কিন্তু, আমিন তা প্রত্যাখান করেন।
কিন্তু, সোভিয়েত রাষ্ট্রদূত পুজানোভ পুলিশ প্রধান সাইয়েদ দাউদ তারুন এবং গোয়েন্দা অফিসার নওয়াব আলীর সাথে আমিনকে প্রাসাদে যেতে রাজি করান। প্রাসাদে পৌছানোর পর, অজ্ঞাত ব্যক্তিরা ভবনের ভেতর থেকে গুলি চালায়, এতে দাউদ তারুন নিহত ও নওয়াব আলী আহত হলেও, আমিন বেঁচে যান। পরে, আমিন একদল সেনা অফিসারদের নিয়ে প্রাসাদে ফিরে তারাকিকে গ্রেপ্তার করেন। তারাকিকে গ্রেপ্তারের পর আমিন সোভিয়েতের সাথে পরবর্তী করণীয় সম্বন্ধে আলোচনায় বসেন। সোভিয়েত ইউনিয়ন এ ঘটনায়, তাকে তার মর্জিমত ব্যবস্থা গ্রহণ করতে বললে, আমিন তারাকিকে হত্যার নির্দেশ দেন।এরপরে, আমিন রাষ্ট্রপতি হয়।
আমিন পিডিপিএর মধ্যে তার প্রতিদ্বন্দ্বীদের এবং ক্রমশ শক্তিশালী হয়ে উঠা বিদ্রোহীদের কঠোর হাতে দমনের চেষ্টা চালান, যার ফলে তার শাসনামলে বিশৃঙখলা ও নৈরাজ্য তীব্রতর হয়ে ওঠে।যেহেতু বিরোধী দলের উপর দমন পীড়ন চলছিল তখন, কামাল বারবাক বিদেশে পালিয়ে যান। এরপর, সোভিয়েত ইউনিয়ন যখন ১৯৭৯ সালের ডিসেম্বরে আফগানিস্তানে প্রবেশ করে তখন বারবাক রুশ ক্ষমতাবলে দেশে ফিরে আসেন। ২৭ শে ডিসেম্বর, ১৯৭৯ সালে তিনি বিপ্লবী কাউন্সিল ও মন্ত্রী পরিষদের সভাপতি হন এবং সেবছর প্রেসিডেন্ট হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন। কিন্তু, নীতি বাস্তবায়নে ব্যর্থতার জন্যে সোভিয়েত ইউনিয়ন তার দেশ পরিচালনাকে ঝুঁকিপূর্ণ মনে করে। তাই, মিখাইল গর্ভাচেভ ক্ষমতায় আসার পরে বারবাককে হটিয়ে দেন এবং মোহাম্মদ নাজিবুল্লাহকে তার স্থলাভিষিক্ত করে। বারবাক মস্কোয় নির্বাসিত হন।
১৯৭৯ সালে সোভিয়েত ইউনিয়নের সৈন্যরা আফগানিস্তানে প্রবেশ করে, তারা একের পরেক আফগানিস্তানের সমতল ভূমি দখল করতে থাকে। আর পাহাড়ি অঞ্চল, ইসলামপন্থী মুজাহিদীনদের দখলে ছিল।মুজাহিদীনদের অস্ত্র আর মিসাইল দিয়ে সহায়তা করত মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র।
সোভিয়েত ইউনিয়ন কেন আফগানের মাটি দখল করেছিল আর কেনইবা যুক্তরাষ্ট্র মুজাহিদীনদের সহায়তা করেছিল, তা জানার আগে সোভিয়েত-আফগানিদের কূটনৈতিক সম্পর্ক কেমন ছিল তা জানা প্রয়োজন।
১৯৭০ সালে আফগান সরকারের সাথে সোভিয়েত ইউনিয়নের একটি পারস্পরিক সহায়তার দ্বিপাক্ষিক চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়, যার বদৌলতে সোভিয়েত সরকার আফগানিস্তানে কূটনৈতিক ও বিশেষ উপদেষ্টা দল পাঠায়। এ চুক্তির মাধ্যমে, আফগান সরকার সোভিয়েত ইউনিয়ন থেকে সামরিক সহায়তা লাভের সমর্থন আদায় করে নেয়। যেহেতু, আফগানিস্তানে বামপন্থী সরকার ক্ষমতাসীন আর সোভিয়েত ইউনিয়নেও বামপন্থী সরকার ছিল, তাই তাদের মধ্যে পারস্পরিক আদর্শগত ও নীতিগত ঐক্য ছিল। এছাড়াও, আফগান সরকার ভয়ে ছিল, পার্শ্ববর্তী দেশ ইরানে আয়াতুল্লাহ খোমেনির নেতৃত্বে ইসলামিক বিদ্রোহের ফলে সেদেশে ইসলামিক শাসন প্রতিষ্ঠিত হয়। এতে,সোভিয়েত ইউনিয়ন ভীত হয়ে পড়ে যে, আফগানিস্তানেও ইসলামপন্থীরা বিদ্রোহ করে দেশে ইসলামি শাসন বাস্তবায়ন করতে পারে।
১৯৭৯ সালের গ্রীষ্মকালে আফগান সরকার, ১৯৭৮ সালে করা চুক্তির প্রেক্ষতে ইসলামিক মুজাহিদীনদের বিদ্রোহ দমনের জন্যে সোভিয়েত সরকারের কাছে নিরাপত্তা বিধানের জন্যে সহায়তা চায়। এ আবেদনের প্রেক্ষিতে, ১৯৭৯ সালের ১৪ এপ্রিল আফগান সরকার সোভিয়েত ইউনিয়নকে ক্রু, ট্যাংক সহ ১৫ থেকে ২০ টি হেলিকপ্টার প্রেরণ করেছিল।কিন্তু, পরিস্থিতি বেসামাল হবার দরুন এবং একটি গৃহযুদ্ধের আশংকায় সোভিয়েত ইউনিয়ন অসংখ্য সেনা পাঠায় আফগানিস্তানে। ফলে, আফগানিস্তানের ছোট ছোট ইসলামপন্থী দলগুলো এক হয়ে যায় আর সোভিয়েত সরকারের মদদপুষ্ট আফগান সরকারের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করে। এসময়, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র সোভিয়েত বিরোধী এসব ইসলামিক দলের সবচেয়ে বড় বন্ধু ছিল, এবং তাদের ট্যাংক, মিসাইল, অস্ত্র দিয়ে তারা সাহায্য করতে থাকে। আফগানিস্তান হয়ে উঠে স্নায়ুযুদ্ধের বাস্তব যুদ্ধক্ষেত্র!
অন্যদিকে অন্যান্য ইসলামিক দেশগুলোও আফগানের মুজাহিদীনদের সহায়তা করা শুরু করে এবং আশেপাশের মুসলিম দেশগুলো হতে অনেক মুসলমান এ যুদ্ধে অংশ গ্রহণ করে।উপায়ান্তর না দেখে, সোভিয়েত ইউনিয়ন রুশ সেনার সংখ্যা বাড়াতে থাকে এবং তার সংখ্যা ১৯৮০ এর দিকে এক লাখের কিছু বেশিতে গিয়ে দাঁড়ায়। পাকিস্তান হয়ে উঠে আফগানিস্তানে অস্ত্র চালানের অন্যতম রুট। দেখা যেত,যুক্তরাষ্ট্র পাকিস্তানের মাধ্যমে মুজাহিদীনদের অস্ত্র সাহায্য পাঠাত। এরফলে, পাকিস্তানের সাথে আফগানিস্তানের মারমুখো সম্পর্ক হয়ে দাঁড়ায়। এছাড়াও, পাকিস্তানের সাথে আফগানিস্তানের মতাদর্শিক পার্থক্য ছিল। কারন, পাকিস্তান একট ইসলামি রাষ্ট্র ছিল আর আফগানিস্তানের বাম পন্থি সরকারের বিরোধী ছিল। তাছাড়াও, যুক্তরাষ্ট্রের অন্যতম মিত্র হবার কারনে, পাকিস্তান যুক্তরাষ্ট্রকে এ ব্যাপারে সহায়তা করেছিল।
এছাড়াও, চীন সরকার এ যুদ্ধে সোভিয়েত ইউনিয়ন বিরোধী ছিল এবং মুজাহিদীনরা চীন ও পাকিস্তানে প্রশিক্ষণ নিয়েছিল। ক্ষমতার দ্বন্দে চীনা সরকার, সোভিয়েত ইউনিয়নের বিপক্ষে অবস্থা নিয়েছিল।
বিশ্বের প্রায় ৩৪টি মুসলিম দেশ এ যুদ্ধে মুজাহিদীনদের পক্ষ নিয়েছিল এবং জাজিরাতুল আরব সহ, আরব পারস্য গাল্ফ উপকুলবর্তী দেশগুলো থেকেও তারা বিপুল আর্থিক সহায়তা পেয়েছিল। যার জন্যে, চারিদিক থেকে সোভিয়েতরা কোণঠাসা হয়ে পড়েছিল এবং তেমন সুবিধা করতে পারে নি এ যুদ্ধে!১৯৭৯ সাল থেকে শুরু হওয়া এ যুদ্ধ ১০ বছর পর্যন্ত স্থায়ী হয় যার জন্য গণমাধ্যমে একে ‘সোভিয়েতের ভিয়েত যুদ্ধ’ নামে অভিষিক্ত করা হয়।
বারবাক কারমাল ও নাজিবুল্লাহ এ সময় কমিউনিজম থেকে সরে আসতে চেয়েছিল; তাদের ক্ষমতাকে কিছুকাল স্থায়ী করার জন্যে। তারা, দেশ হতে অনেক কমিউনিস্ট চিহ্ন অপসারণ করে, ইসলামকে ১৯৮৭ সালে, সংবিধানে ২ অনুচ্ছেদে রাষ্ট্র ধর্ম ঘোষণা করে এবং ১৯৯০ সালের সংবিধানে আফগানিস্তানকে ইসলামি রাষ্ট্র ঘোষণা করা হয়। কিন্তু, এতেও শেষ রক্ষা হয় নি পিডিপিএর! জনসমর্থন ইসলামি মুজাহিদীনদের পক্ষেই রইল আর তারাও কমিউনিস্ট সরকারের পতনে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ হয়ে রইল।
তাই তো, জনসমর্থন ও মুজাহিদীনদের মনোবলের কাছে হেরে যায় সোভিয়েত ইউনিয়ন আর ১৯৮৮ সালের ১৪ই এপ্রিল চুক্তি স্বাক্ষর করে, যেটায় বলা হয় ১৯৮৯ সালের ১৫ই ফেব্রুয়ারী থেকে সৈন্য প্রত্যাহার করা শুরু হবে। সোভিয়েত সৈন্যরা যখন চলে যায়, তখন আফগান বামপন্থী সরকার আর মুজাহিদীনদের মধ্যে যুদ্ধ চলতেই থাকে, এ যুদ্ধকে জালালাবাদের যুদ্ধ বলা হয়। অবশেষে, ১৯৯২ সালে রুশ সরকার, নাজিবুল্লাহকে সব রকমের সাহায্য দেয়া বন্ধ করে দেয়।ফলে, জ্বালানির অভাবে বিমানবন্দর বন্ধ হয়ে যায়। দেশের সব গুলো গুরত্বপূর্ণ বন্দর প্রতিপক্ষদের হাতে চলে আসে।
সেবছর, এপ্রিলে তিনি জাতিসংঘের প্রস্তাবিত অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের রূপরেখা গ্রহন করেন এবং সাত সদস্য বিশিষ্ট কাউন্সিলের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তর করে দেশ ত্যাগ করতে চাইলেও পারেন নি, বিদ্রোহীদের হাতে ধরা পড়েন। তখন, তিনি কাবুলে জাতিসংঘের দপ্তরে আশ্রয় নেন এবং ১৯৯৬ সালে তালেবানরা ক্ষমতা দখলের আগ পর্যন্ত সেখানেই অবস্থান করেন। ১৯৯৬ সালের ২৮ শে সেপ্টেম্বর তালেবানরা তাকে গ্রেপ্তার করে এবং প্রকাশ্যে ফাঁসির কাষ্ঠে ঝুলায়।
এ যুদ্ধে সোভিয়েত ইউনিয়ন ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতির শিকার হয়। বলা হয়ে থাকে, এ যুদ্ধের ফলেই সোভিয়েত ইউনিয়নের পতন হয় কারন সেনা প্রত্যাবর্তনের ঠিক দুই বছরের মাথায় সোভিয়েত ইউনিয়নের বিলুপ্তি ঘোষণা করা হয়,যা সে দেশের সবচেয়ে বড় কূটনৈতিক পরাজয় ছিল এবং সোভিয়েত ইউনিয়ন ভেঙ্গে ১৫ টি রাষ্ট্রের জন্ম হয়। এ যুদ্ধে প্রায় পনের হাজার সোভিয়েত সৈন্য মারা গিয়েছিল। দীর্ঘদিন চলে আসা এ যুদ্ধে সেনাদের মধ্যেও অন্তর্দ্বন্দ শুরু হয় এবং এ যুদ্ধের যৌক্তিকতা নিয়ে রুশ জনমনেও সন্দেহ জাগতে শুরু করে। যার ফলে, মিখাইল গর্ভাচেভের পেরেস্ত্রোইকা নীতি অনুসারে, তিনি এ রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের সমাপ্তি ঘোষণা করেন এবং সেনা প্রত্যাবর্তনের নির্দেশ দেন, যা চূড়ান্ত ভাবে শুরু হয় ১৯৮৯ সালের ১৫ মে থেকে।
এ যুদ্ধও ভিয়েতনাম যুদ্ধের মত একটি ব্যর্থ যুদ্ধ সোভিয়েতদের জন্যে, কারন এ যুদ্ধে তাদের ক্ষয়ক্ষতির পরিমান অত্যধিক ছিল। আর, তাছাড়াও, এ যুদ্ধের অর্থের যোগান দিতে গিয়ে তাদের নিজ দেশে আর্থ-সামাজিক সংকট দেখা দেয়, যা চিরতরে সোভিয়েত ইউনিয়নকে খন্ড বিখন্ড করে দেয় এবং সোভিয়েত ইউনিয়ন বিলুপ্ত হয়।
(চলবে ইনশাআল্লাহ)।
লেখিকাঃ ফারহীন ন্যান্সি।
সমাজবিজ্ঞান বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।
