![]() |
| ৩৮° প্যারালেল লাইন। |
কোরীয় সংকটঃ বিংশ শতাব্দীর অন্যতম বড় একটি বিভাজন।
৩৮° অক্ষরেখা বরাবর বিভক্তির পর, সোভিয়েত ইউনিয়ন ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র কিম ইল সাং আর সিং ম্যান রিং এর কাছে ক্ষমতা হস্তান্তর করে স্বদেশে প্রত্যাবর্তন করে।
কিন্তু, ততদিনে মতাদর্শের পার্থক্য তীব্র আকার ধারণ করে দুই দেশের মধ্যে। এরমধ্যে, দক্ষিন কোরিয়ার কিম ইল সাং ভাবতে থাকেন কোরিয়া অখন্ডিত থাকবে এবং সমগ্র কোরিয়া কমিউনিস্ট পন্থী হবে, অন্যদিকে সিং ম্যান রীও ভাবতে থাকেন কোরিয়ার বিভাজন অযৌক্তিক কিন্তু সমগ্র কোরিয়া থাকবে পুঁজিবাদের আওতায়! সংকট তো আসন্ন!
ইতোমধ্যে, উত্তর কোরিয়া তার সামরিক শক্তির দিকে জোর দেয়! সামরিক শক্তি বৃদ্ধিতে পারমানবিক শক্তি বাড়ানোর পরিকল্পনা করতে থাকে ও অস্ত্র উৎপাদন করা শুরু করে দেয় ১৯৪৮-১৯৫০ সালের মধ্যে। উত্তর কোরিয়ার এভাবে শক্তিশালী হয়ে উঠার জন্যে সোভিয়েত ইউনিয়ন দায়ী ছিল, কারন তখন সোভিয়েত ইউনিয়ন উত্তর কোরিয়াকে নানান যুদ্ধযান, যুদ্ধসামগ্রীর রসদ যোগাচ্ছিল।
অন্যদিকে দক্ষিন কোরিয়াকে সাহায্য করছিল যুক্তরাষ্ট্র। দক্ষিন কোরিয়া তখনো দেশের টালমাটাল অর্থনৈতিক অবস্থা সামলাতে হিমসিম খাচ্ছিল এবং তখনও সামরিকভাবে শক্তিশালী হয়ে উঠতে পারে নি। যুক্তরাষ্ট্রও, দক্ষিণ কোরিয়াকে সামরিক সহযোগিতা করেছে কিন্তু সোভিয়েত ইউনিয়ন যেভাবে উত্তর কোরিয়াকে সহায়তা করছিল, ঠিক সেভাবে নয়! আর, সামরিকভাবে এগিয়ে থাকার জন্যে একটি দেশের সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন ট্যাংক অথচ সেই ট্যাংকই ছিল না দক্ষিন কোরিয়ার কাছে!
এমতাবস্থায় ২৫ শে জুন, ১৯৫০ সালে উত্তর কোরিয়া দক্ষিন কোরিয়াকে আচমকা আক্রমণ করে বসে।আর, এই আক্রমণের উদ্দেশ্য ছিল গোটা কোরিয়ান উপদ্বীপকে একক শাসনের অধীনে করা!
এসময়, জাতিসংঘে দক্ষিন কোরিয়াকে যুদ্ধে সহায়তা করার বিষয়ে একটি রেজ্যুলিউশন পাস হয়। যেখানে বলা হয় দক্ষিন কোরিয়াকে মিলিটারি আর্মি পাঠিয়ে সাহায্য করা হবে। এবং, এই ইউএন ফোর্সের নাম হবেঃ ইউনাইটেড নেশনস কমান্ড ফর কোরিয়া।এ সেনাদলে, ৯০% সৈন্য ছিল যুক্তরাষ্ট্রের। এছাড়াও , যুক্তরাজ্য, তুর্কি, ফ্রান্স থেকেও সৈন্য পাঠানো হয়েছিল। আর সেসময়, এই সিকিউরিটি কাউন্সিলের বিরুদ্ধে সোভিয়েত ইউনিয়ন ভেটো প্রদান করতে পারে নি কারন তখনও ইউএসয়ার, নিরাপত্তা পরিষদের সদস্য ছিল না। তদপুরি, সোভিয়েত ইউনিয়ন এই সিকিউরিটি কাউন্সিলকে বহিষ্কার করতে উঠে পড়ে লেগেছিল।
তার কারন হচ্ছে, সেসময় চীনে গৃহযুদ্ধ চলছিল। যুদ্ধের পরে দুটি দেশ গঠিত হয়। একটি হলো, পিপলস রিপাকলিক অফ চায়না বা পি আর সি, সেটিতে ক্ষমতাসীন ছিল কমিউনিস্ট পার্টি এবং আর ও সি, তথা রিপাবলিক অফ চায়না! আর এই, আর ও সি ছিল ন্যাশনালিস্ট, যুক্তরাষ্ট্র ব্লকের। এই, আর ও সি সরকার নিরাপত্তা পরিষদের অংশ ছিল এবং তার হাতে ভেটো প্রদান করার ক্ষমতা ছিল।
১৯৪৯ সালে এই আর ও সি, পি আর সি এর কাছে হেরে যায় এবং তাইওয়ানে পালিয়ে যায়। সেখানে, তারা আলাদা সরকার গঠন করে, যেটি রিপাকলিক অফ চায়না নামে সম্বোধন পায়।
দৃশ্যপটে পি আর সি তথা পিপলস রিপাকলিক অফ চায়না এবার গোটা চীনের একক ক্ষমতাসীন দলে পরিণত হয় আর সোভিয়েত ইউনিয়ন এই কমিউনিস্ট পার্টিকে তাদের পূর্ণ সমর্থন দেয়। সেই সাথে, তারা চাইত ভেটো প্রদান করার ক্ষমতা এই পি আর সি এর হাতে আসুক। কিন্তু, অন্যান্য দেশ সোভিয়েতের এই সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানায় নেই, তাই সোভিয়েত ইউনিয়ন এই কাউন্সিলকে বহিষ্কার করার জন্যে ব্যস্ত হয়ে পড়ে। এভাবেই, চীন ইস্যুতে জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদের সাথে সোভিয়েতের দ্বন্দের সূত্রপাত হয়।
এদিকে, জাতিসংঘ দক্ষিন কোরিয়ায় সৈন্য পাঠাচ্ছে আর তা আটকাতে ব্যর্থ হচ্ছে সোভিয়েত ইউনিয়ন এই ভেটো প্রদান করতে না পারার জন্যে!
উত্তর কোরিয়ার আর্মি সামরিকভাবে শক্তিশালী হওয়ায় বুশান বাদে দক্ষিন কোরিয়ার অন্যান্য অঞ্চল দখল করে নেয়। এরপর, আমেরিকার সৈন্যরা জেনারেল ডাগরোস ম্যাকার্তের নেতৃত্বে, দক্ষিন কোরিয়াকে সহায়তা করতে আসে।
জেনারেল ম্যাকার্তে এমন একজন দূরদর্শী কিন্তু নৃশংস ব্যক্তিত্বের অধিকারী ছিলেন যার কমান্ডে যুক্তরাষ্ট্র দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে অভাবনীয় সাফল্য পায়। জেনারেল ম্যাকার্তের নির্দেশে সৈন্যরা ৩৮° প্যারালাল লাইন বরাবর যে নৌবন্দরটি(ইনচং) আছে, যেটি দক্ষিন ও উত্তর কোরিয়াকে সংযুক্ত করে, সেটিকে দখল করে নেয়। ফলে, উত্তর কোরিয়া আর দক্ষিন কোরিয়ার সাথে যোগাযোগ করতে পারল না, কোনো সেনা, যুদ্ধ সামগ্রী, খাদ্য রেষণ, কিছুই পাঠাতে পারল না! ফলাফল, কিছুদিনের মধ্যেই উত্তর কোরিয়দের যুদ্ধ স্পৃহা স্তিমিত হয়ে আসে। এভাবে, খুব সহযে গোটা দক্ষিন কোরিয়াকে উদ্ধার করে নেন জেনারেল ম্যাকার্তের।
কিন্তু, জেনারেল ম্যাকার্তের শুধু দক্ষিন কোরিয়াকে নিয়ন্ত্রণে এনেই ক্ষান্ত হোন নি বরং, বরং তিনি ৩৮° অক্ষরেখা বরাবর এগিয়ে যেতে থাকেন সম্মুখে, আর একের পরেক দখল করতে থাকেন উত্তর কোরিয়ার অঞ্চলগুলোকে। যদিও, এই ধরণের কোনো নির্দেশ দেয়া হয় ইউ এনের তরফ হতে জেনারেল ম্যাকার্তের কে। তবুও, অসম সাহসী নির্ভীক ও সেই সাথে নিয়ম নীতির পরোয়া না করা অবাধ্য; এ জেনারেল এগিয়ে যেতে থাকেন তার নিজস্ব পরিকল্পনা মোতাবেক। তার মাথায় চেপেছে তখন সমগ্র কোরিয়া দখল করার উন্মাদনা!
এভাবে, চীন ও উত্তর কোরিয়ার বর্ডারে যে ইয়ানু নদী আছে, সে পর্যন্ত পৌছে যায় ম্যাকার্তের আর্মি! যুক্তরাষ্ট্রের তৎকালীন প্রেসিডেন্ট ট্রুম্যান ম্যাকার্তেকে আদেশ করে ফিরে যেতে, তাকে বলা হয়েছিল ৩৮° সীমারেখা পর্যন্ত এলাকা কব্জা করে সীমাবদ্ধ থাকতে, কিন্তু জেনারেল ম্যাকার্তের তার কথা অগ্রাহ্য করে এগিয়ে যেতে থাকেন সেনাবহর নিয়ে।
ট্রুম্যানের আশংকা ছিল যে চীন-উত্তর কোরিয়ার বর্ডার পর্যন্ত চলে গেলে, চীনও এ যুদ্ধে জড়িয়ে পড়তে পারে! তার, আশংকা অমূলক ছিল না, বরং সত্যি তাই হলো। চীন- উত্তর কোরিয় জোট তৈরি হলো, যুক্তরাষ্ট্র-দক্ষিন কোরিয়া বিরোধী এবং তারা যুদ্ধে নেমে গেল।
ইয়ানু নদী অবধি ইউএন আর্মি পৌছুলে চীন আক্রমণ শুরু করে দেয় এবং ইউএসএর সৈন্য সেখান হতে পলায়ন করে। চীন আক্রমণ করতে করতে, মার্কিনি সেনাদলকে ৩৮° রেখা বরাবর নিয়ে আসে ও ফেরত পাঠায়। এবার, চীনা বাহিনিও দক্ষিন কোরিয়ার স্থান দখল করা শুরু করে দিল।
চীন ঠিক কি কারনে এ যুদ্ধে জড়িয়ে পড়েছিল তা অস্পষ্ট হলেও, কয়েকটি কারন তুলে ধরা হলো,
১. চীন একটি কমিউনিস্ট দেশ। উত্তর কোরিয়াও একটি কমিউনিস্ট দেশ এবং সোভিয়েত ইউনিয়নও তাকে সাহায্য করছিল। মতাদর্শিক সাদৃশ্যের জন্য চীন, এ যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেছিল।
২.মাও সেতুং আশংকা করেছিলেন, তিনি যদি নিশ্চুপ থাকেন তবে মার্কিনিরা উত্তর কোরিয়া দখলের পর চীনকেও আক্রমণ করবে। চীন-উত্তর কোরিয় বনাম যুক্তরাষ্ট্র-দক্ষিন কোরিয়ার এ যুদ্ধ চলতে থাকে ১৯৫০ অবধি।
১৯৫১ সালে ম্যাকার্তের দক্ষিন কোরিয়ার সিউল সহ গুরত্বপূর্ণ অঞ্চলসমূহ আবার দখল করে নিলেন। এবং তিনি চীনের বিরুদ্ধে পারমাণবিক অস্ত্র ব্যবহারের হুমকি দিতে থাকলেন।
তিনি, যুক্তরাষ্ট্রকে বারবার দরখাস্ত করতে থাকেন যেন ইউএসএ চীনের উপর পারমাণবিক বোমার হামলা চালায়! পরবর্তীতে, আমেরিকার প্রেসিডেন্ট জেনারেল ম্যাকার্তেরকে এ যুদ্ধ থেকে অব্যাহতি দেন এবং ফিরিয়ে নেন কোরিয়া হতে।
কারন, আমেরিকা তখন হিসাব কষল, যদি সে চীনের উপর পারমাণবিক বোমা বর্ষণ করে তবে তার পাল্টা জবাব হিসেবে সোভিয়েত ইউনিয়নও আমেরিকার উপর বোমা হামলা চালাবে! এতে, আমেরিকা-ইউএসএসআর এর যুদ্ধ লেগে যেতে পারে। তাই, নানা হিসেব মিলিয়ে, আমেরিকা জেনারেল ম্যাকার্তেরকে ফেরত নেয়।
এবং, তার পরিবর্তে নতুন জেনারেল নিয়োগ দেয়া হয় যিনি প্রেসিডেন্টের কথামত ৩৮° এর ওপারে যান নি। ৩৮° এর সীমানার মধ্যেই যুদ্ধ চালিয়ে যান।
অন্যদিকে, চীনের সেনারাও সাহস পাচ্ছিল না, ৩৮° রেখা পার করে দক্ষিন কোরিয়াকে আক্রমণ করতে, অপরদিকে আমেরিকার সৈন্যরাও চাচ্ছিল না সংঘাত বাড়াতে। তাই, তারাও ৩৮° প্যারালাল রেখা বরাবরই যুদ্ধ করতে থাকে। কেউ আর কাউকে দখল করে নি,সীমান্ত বরাবর শুধু আক্রমণ পালটা আক্রমণ চালাতে থাকে। এভাবে, যুদ্ধ আরো ২ বছর চলতে থাকে।
অতঃপর ২৭ শে জুলাই, ১৯৫৩ সালে একটি যুদ্ধবিরতির চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। সেই চুক্তিতে একটি ডিমিলিটিরাইজড জোন গঠনের প্রস্তাব দেয়া হয়। ৪ কিমি এর এ ডিমিলিটারাইজড জোন গঠিত হবে,যেখানে কোনো সৈন্য থাকতে পারবে না।
তবে, লক্ষ্যনীয় বিষয় হচ্ছে যে, দক্ষিন কোরিয়া ও উত্তর কোরিয়ার মধ্যে কিন্তু কোনো শান্তি চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়নি, কেবল একটা যুদ্ধবিরতির চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছে। তাই তো, আক্ষরিক অর্থে তাদের মধ্যে বিদ্যমান এ যুদ্ধ কখনো থামে নি বরং তা এখনো চলমান।
অর্থাৎ, এই ডিমিলিটারাইজড জোন বরাবর, উত্তর ও দক্ষিন উভয় পাশের ২ কিমি করে মোট ৪ কিমি অঞ্চলে সৈন্যরা কোনো যুদ্ধ পরিস্থিতি তৈরি করতে পারবে না। কিন্তু, সেনাদের নিয়ে দৈনন্দিন প্যাট্রলিং করতে পারবে, কিন্তু কোনো ভাবেই উদ্দেশ্যমূলক আক্রমণ করা যাবে না৷
কিন্তু, এ বর্ডার বরাবর যত সৈন্য মোতায়েন করা হয়েছে, পৃথিবীর আর কোনো সীমান্ত বরাবর এতো সৈন্য মোতায়েন করা হয় না! এ জোনে কোনো মানুষের প্রবেশাধিকার নাই, তাই বন্য পশুপাখিদের অভয়ারণ্য হয়ে উঠেছে এ অঞ্চলটি।
কি ছিল এ যুদ্ধের ফলাফল?! ঠিক কি পেয়েছে দেশ দুটি আর ঠিক কি লাভ হলো পরাশক্তি গুলোর এ যুদ্ধে জড়িয়ে?!
উত্তর, এ যুদ্ধে সাধারণ মানুষ মারা গিয়েছিল প্রায় ২.৫ মিলিয়ন। এবং সৈন্য মারা যায় প্রায় ১ মিলিয়ন। প্রচুর বোমা বর্ষিত হয় এ যুদ্ধে৷ শুধু সিউলেই ৪ বার বোমা হামলা করা হয়, যার জন্যে অনেক প্রাণহানি হয়। সাধারণ মানুষের ভোগান্তি বেড়ে যায়। তিন বছরে, উত্তর কোরিয়ায় প্রায় ৯ মিলিয়ন আর দক্ষিন কোরিয়ায় প্রায় ১৬ মিলিয়ন মানুষ অর্থাৎ মোট ২৫ মিলিয়ন মানুষ মারা যায় এ যুদ্ধে!
মিলিয়ন মিলিয়ন অর্থ খরছ হয়েছে! কিন্তু, এত কিছুর পরেও কোনো ধরণের রাজনৈতিক বা ভৌগলিক পরিবর্তন হয় নি। অর্থাৎ, বিশ্বের ইতিহাসের আরেকটি ফিউটাইল ওয়ার বা ব্যর্থ যুদ্ধ এই কোরীয়ান যুদ্ধ যা শুধু বিভাজন বাড়িয়েছে! আর উস্কে দিয়েছে নতুন নতুন আরো প্রক্সি ওয়ারের।
কারন, এক ব্যর্থতা উস্কে দেয় আরো নতুন নতুন ব্যর্থতার!
পরাশক্তিগুলোর আঁতে ঘা লাগায়, তারা সে ঘা শুকানোর জন্যে উপসম হিসেবে বেঁছে নেয় নতুন ক্ষেত্র, নতুন ইস্যু, নতুন পরিস্থিতি! যাতে করে, ক্ষমতার দ্বন্দে সামাজিক ডারউইনিজমের বৃত্তান্তে তারা নিজেদের প্রমাণ করতে পারে, তারা অন্যদের তুলনায় শ্রেয়, শ্রেয়তর!!
লেখিকাঃ ফারহীন ন্যান্সি।
সমাজবিজ্ঞান বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।
