![]() |
| গ্রেগরি রাসপুতিন। |
“There lived a certain man in Russia long ago,
He was big and strong, in his eyes a flaming glow,
Most people looked at him with terror and with fear,
But to Moscow chicks he was such a lovely dear.
Ra ra Rasputin,
Lover of the Russian queen
There was a cat that really was gone,
Ra ra Rasputin
Russia’s greatest love machine
It was a shame how he carried on.
He ruled the Russian land and never mind the Czar.”
সম্প্রতি করোনার এই ক্রান্তিলগ্নে, মৃত্যুমিছিলে শশব্যস্ত হাসপাতালে এ যুগের মানবতার মসিহ ডাক্তাররা যখন আক্রান্ত রোগীদের অক্সিজেনের চাহিদা মেটাতে মরিয়া; তখন কেরালার দুজন মেডিকেল স্টুডেন্টকে হাসপাতালে এই গানে নাচতে দেখা যায়, এই মৃত্যুর মিছিলে, ঘোরতর অন্ধকারে তারা যেন একটু ক্লান্তি ঘুচাতে চাচ্ছিল হালকা স্ফুর্তির মাধ্যমে!
আবার, ইদানিং খুব চলছে আশির দশকে এম বোনির গাওয়া পপুলার রক ডিস্কো গান ‘রাসপুতিন’। এখন, এটি রীতিমতো টিকটক ট্রেন্ডের শীর্ষে।
কিন্তু, কে এই রাসপুতিন; যিনি শতেক বছর আগে মৃত্যুবরণ করেও, ইতিহাসের পাতা হতে ফের জগত বিখ্যাত হয়ে ফিরে এসেছেন একবিংশ শতাব্দীতে?
কি তার নেপথ্যে কাহিনী?! কে ছিলেন এই রাসপুতিন, তার ভূমিকা কি রাশিয়ার ঐতিহাসিক জারতান্ত্রিক রাজনীতিতে? কি তার জীবনী?!
চলুন আজ জেনে নেই রাশিয়ার ত্রাশ এবং তৎকালীন নারী সমাজের ক্রাশ এই ‘রাসপুতিনের জীবনী গানের জবানীতে, ছন্দে ছন্দে আমরাও গাই,
‘ রা রা রাসপুতিন, লাভার অফ দা রাশিয়ান কুইন,
রাশিয়া’স গ্রেটেস্ট লাভ মেশিন,
হি ওয়াজ বিগ এন্ড স্ট্রং, ইন হিজ আইজ ওয়াজ এ ফ্লেমিং গ্লো!”
পুরো নাম গ্রেগরি ইয়েমেফোভিচ রাসপুতিন। জন্মেছিলেন সাইবেরিয়ার তুরা নদীর তীরে পত্রুভস্কায়া নামের ছোট্ট একটি গ্রামে। তিনি ছিলেন, একজন রুশ সন্ন্যাসী এবং জার দ্বিতীয় নিকোলাসের দরবারে একজন বিশিষ্ট ব্যক্তিত্ব। সেই সাথে ছিলেন জারপত্নী আলেকজান্দ্রার বিশেষ উপদেষ্টা এবং সেই সূত্রে রাজদম্পতির উপরে ছিল তার অস্বাভাবিক রকমের প্রভাব। সেই ঘনিষ্ঠ সম্পর্কের জেরেই রাশিয়ার জারতন্ত্রের ইতিহাসে ঘটাতে থাকেন একের পরেক ঘটনা এই ঘটন অঘটন পটিয়সী রহস্যময় ব্যক্তি! তার নামে রটনা ছিল অনেক। তিনি ছিলেন মাদকাসক্ত এবং নারী পিপাসু। তাঁর চরিত্র নিয়ে তখন হরহামেশাই শোনা যেত কানাঘুষা।
কিন্তু কি পরিতাপের বিষয়, এই নারী লিপ্সা আর মদই হয়ে যায় তার জীবনের কাল! সাইবেরিয়ান তৃণভুমিতে পশু চরানো সেই রাখালবালক যিনি তার নোংরা অবয়ব আর দুর্গন্ধী শরীর নিয়ে রাজদরবারে দিব্যি ঘুরে বেড়াতেন, তিনিই হয়ে উঠেন তৎকালীন নারীসমাজের কাছে আকর্ষণের কেন্দ্রবিন্দু!
রাজনৈতিক সুবিধা দেবার নামে চালিয়ে যেতেন সম্ভোগ উৎসব বড় অবলীলায়।
![]() |
| জার পরিবার। |
তাই তো, নির্ধিদায় তিনি আকৃষ্ট করতে পেরেছেন জারিনা আলেকজান্দ্রাকে। সেসময় প্রত্যেক রাশিয়ান নাগরিক মনে করতেন যে জারিনার সাথে রাসপুতিনের সম্পর্ক ছিল উপদেষ্টা থেকে কিছু উপরে। তাদের অনৈতিক এই সম্পর্কের গুঞ্জন ছড়িয়ে পড়েছিল দেশে বিদেশে৷ তবুও বলতে হয়, জার পরিবারের সাথে ঘনিষ্ট সম্পর্ক খ্যাতির সাথে সাথে এনে দিয়েছিল বিষদৃষ্টি যেটার শিকার হয়েই কুপোকাত হয়েছিলেন এই শক্তিধর অনাবিল সম্মোহন শক্তির অধিকারী রহস্যময় ব্যক্তিত্ব!
| প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময় জার্মানির প্রতি পক্ষপাতিত্ব করার জন্যে রাজদরবারের সদস্যরা তাকে গুপ্তভাবে হত্যা করে। |
![]() |
| সভাসদের সাথে রাসপুতিন। |
ইতিহাসের এক পুরোধা ব্যক্তিত্ব রাসপুতিন। ছিলেন ধর্মযাজক। যেই একবার তার সাথে কথা বলত সেই সম্মোহিত হয়ে পড়ত তার কথাবার্তায় আর নীল কুঁতকুতে চোখের আবছায়ায়! গুনমুগ্ধ হয়ে পড়ত সকলে অথচ পরণে থাকত নোংরা হলদেটে আলখেল্লা,জীর্ণ শীর্ণ দাড়ি গোঁফে একাকার মুখ, মাঝখানে সিঁথি কাটা লম্বা লম্বা চুলের ছায়ায় আড়াল হয়ে যেত তার মুখ৷ তবুও এই সন্ন্যাস পুরুষের প্রতি আকৃষ্ট হতো নারীরা মধুমক্ষিকার মত!
পূর্ব জীবনে ছিলেন গেঁয়ো চাষী। অলৌকিকভাবে নাকি সারিয়ে তুলতে পারতেন মানুষের রোগ আর ভবিষ্যতবাণীও নাকি করতে পারতেন যা মিলে যেত খাপে খাপ। আর এসব ক্ষমতাবলেই তিনি নিকোলাস পত্নী আলেকজান্দ্রার বিশেষ মনোযোগ আকর্ষণ করতে সক্ষম হোন। জারিনার উপরে ছিলো তার বিশেষ প্রভাব। রাসপুতিনের প্ররোচনায় সম্রাজ্ঞী আন্দোলিত হতেন আর তার বুদ্ধিতেই জার সিদ্ধান্ত নিতেন।
![]() |
| জারিনা আলেকজান্দ্রা। |
*যেভাবে পরিচয় জারপরিবারের সাথে**
রাশিয়ার জার দ্বিতীয় নিকোলাস ও জারিনা আলেকজান্দ্রা বহু বছর চেষ্টা করেও যখন কোনো পূত্রসন্তান বা উত্তরাধিকারী জন্ম দিতে ব্যর্থ হোন তখন তাদের শেষ ভরসা হিসেবে ১৯০৪ সালে, কোল আলো করে আসে পূত্র আলেকজান্ডার নিকোলায়েভিচ। পরপর চার কন্যা সন্তানের পর জন্ম নেয়া আলেকজান্ডার ছিল জার আর জারিনার চোখের মনি। এ, পূত্রকে পাবার জন্য এ রাজ দম্পতি বহু সন্ন্যাস, পীর, দরবেশ, কবিরাজ,পুরোধা পুরুষের শরণাপন্ন হোন কুসংস্কারাচ্ছন্ন হয়ে! কিন্তু, বিধিবাম!
আদরের রাজপুত্র আক্রান্ত হয় রাজরোগ হেমোফিলিয়ায়। তারা আবার ছোটাছুটি করতে লাগলেন, হাকিম, কবিরাজ, সাধগুরুদের কাছে- কোনো মোজেজার আশায়! কারন, সেই সময়ে হেমোফিলিয়ার একমাত্র পরিনতি ছিল- মৃত্যু।ধুঁকে ধঁকে মারা যেত আক্রান্তরা রক্তক্ষরণে!
কিন্তু কিছুতেই যেন কিছু হচ্ছিল না! কারুর ঔষধ, চিকিৎসায় কোনো কাজ হচ্ছিল না।কোনো উন্নতি দেখা যাচ্ছিল না আর রাজপুত্র দিন গুনছিলেন আসন্ন মৃত্যুর। এ সময়, জারনন্দনের আরোগ্য লাভের জন্যে ডাকা হয় রাসপুতিনকে। তার, অলৌকিকতার কথা তখন সবার মুখে মুখে। শেষপর্যন্ত, রাসপুতিন জারপূত্রকে সারিয়ে তুলতে সক্ষম হোন। অলৌকিকভাবে অসম্ভবকে সম্ভব করে তুললেও অনেকে মনে করে থাকেন যে তিনি সম্ভবত হিপনোটিজম ব্যবহার করেছিলেন রাজপূত্রের উপর যার জন্য তিনি দ্রুত মরণব্যাধি থেকে আরোগ্য লাভ করতে সক্ষম হোন। কিন্তু, যেভাবেই হোক তিনি সক্ষম হয়েছিলেন জারপরিবারে ঢুকে যেতে বিশেষ করে সম্রাজ্ঞীর মনে জায়গা করে নিয়েছিলেন বিশেষ সম্মানের। এভাবেই, তিনি জড়িয়ে পড়েন রাজপরিবারের নানা ঘটনার সাথে।
একজন সাধারন চাষী ও ভবঘুরে সন্ন্যাসীর রাজদরবারে এহেন উচ্চাসন অভিজাত সভাসদরা ভালো চোখে নেয় নি। তারা, রাসপুতিনকে ভাবতেন একটি ‘ ডার্ক ফোর্স’ বা ‘ব্ল্যাক ম্যাজিকের’ অধিকারী হিসেবে যার সম্মোহন ক্ষমতাবলে বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছিল স্বয়ং জার পরিবার।
![]() |
| জারদম্পতি। |
আর, তার প্রভাব ‘মাদার রাশিয়ার’ জন্য অকল্যাণকর, এই ভেবে সভাসদের কয়েকজন তাকে হত্যা করার সিদ্ধান্ত নেয়। সেই বিশিষ্ট ব্যক্তিবর্গের মধ্যে অন্যতম ছিলেন- প্রিন্স ফেলিক্স ইউসুভপ, গ্রান্ড দেমিত্রি প্যাভলভিচ, ভ্লাদিমির পুরিশকোভিচ, লে. সুখতিন, ড.ল্যাজাভার্ট।
প্রিন্স ফেলিক্স ইউসুভপ ছিলেন জারের ভাইয়ের মেয়ে ইরিনার স্বামী। ইরিনা ছিলেন খুবই সুন্দরী ও বয়সে তরুণী। তাই তো, রাসপুতিনকে হত্যার নীল নকশায় ইরিনার নাম টোপ হিসেবে ব্যবহার করা হয়।
গ্রান্ড ডিউক দিমিত্রি ছিলেন জারের চাচাতো ভাই। দিমিত্রির সাথে জার কন্যা ওলগার এঙ্গেজমেন্টও হয়েছিল কিন্তু দিমিত্রির সমকামিতার স্বভাব প্রকাশিত হয়ে যাবার পর তা ভেঙ্গে যায়।
ভ্লাদিমির পুরিশকোভিচ ছিলেন ডুমার নিম্নকক্ষের একজন স্পষ্টবাদী নেতা। ১৯১৬ সালের ১৬ নভেম্বর তিনি ডুমায় এক জ্বালাময়ী বক্তব্য প্রদান করেন যেখানে তিনি বলেন, জারের মন্ত্রীরা রুপান্তরিত হয়েছেন কাঠপুতুলে যার সুতো নাড়াচ্ছেন রাসপুতিন ও সম্রাজ্ঞী আলেকজান্দ্রা ফিয়োদভরনা যিনি মনেপ্রাণে রয়ে গেছেন জার্মানি এবং দেশ জাতি জনগন থেকে বিচ্ছিন্ন। যাকে বলা যেতে পারে ইভিল জিনিয়াস যিনিই প্রকৃতার্থে রাশিয়ার সিংহাসন ও রাজত্ব নিয়ন্ত্রন করছেন সুদৃঢ় হস্তে!
কিন্তু বোধ হয় তার রাজনৈতিক অদূরদর্শীতা কিংবা বলা যেতে পারে রাসপুতিনের প্ররোচনায় জার প্রলুব্ধ হতে থাকেন একের পরেক উষ্কানিমূলক সিদ্ধান্ত নিতে যা তাকে দেশ ও জনগন থেকে বিচ্ছিন্ন করে দেয়। ফেলিক্স ইউসুপভ পার্লামেন্টে বসে তার এই বক্তব্য শোনেন এবং পরে তার সাথে যোগাযোগ স্থাপন করেন। পুরিশকেভিচ রাসপুতিনকে হত্যার পরিকল্পনা শুনে দ্রুত রাজি হয়ে যান।
ষড়যন্ত্রকারীদের সাথে হাত মেলান লে. সুখতিন। তিনি ছিলেন প্রেওব্রেজনস্কি রেজিমেন্টে কর্মরত একজন সামরিক কর্মকর্তা।
তাদের আরেক সহযোগী ছিলেন ড.ল্যাজাভার্ট।তিনি ছিলেন পুরিশকেভিচের চিকিৎসকের বন্ধু৷ তাকে, ষড়যন্ত্রে শামিল করা হয় কারন একজন তৃতীয় ব্যক্তির প্রয়োজন ছিল গাড়ি চালানোর জন্যে৷
![]() |
| পূত্রের সাথে জার ও জারিনা। |
**খুনের পরিকল্পনা **
ষড়যন্ত্রকারীরা সবাই একত্রিত হয় আর রাসপুতিনকে হত্যার পরিকল্পনা করে। পরিকল্পনাটি তুলনামূলক সহয। সবাই জানত রাসপুতিন ছিলেন কামুক। তিনি নারী সঙ্গ উপভোগ করেন। সেই জন্য তারা ফেলিক্সের সুন্দরী স্ত্রী ইরিনাকে টোপ হিসেবে ব্যবহার করবেন। ইরিনার সাথে রাত কাটানোর প্রস্তাবে প্রলুব্ধ হয়ে রাসপুতিন ফেলিক্সের প্রাসাদে আসবেন আর এভাবে তাকে মধ্যরাতের পরে প্রাসাদে পিছনের গেট দিয়ে ঢুকানো হবে। তাকে মদ্যপান করানো হবে আর সেটায় থাকবে বিষাক্ত পটাসিয়াম সায়ানাইড। বিষে জর্জরিত রাসপুতিনের মরদেহ পরে পার্শ্ববর্তী পেত্রোগার্তের মেলভা নেভকো নদীতে ফেলে দিবে।
কিন্তু, ফেলিক্স পত্নী ইরিনা এই প্রস্তাবে রাজি না হওয়ায় তারা বিপাকে পড়েন এবং তখন তারা সিদ্ধান্ত নেন যে শুধু ইরিনার নাম নিয়েই রাসপুতিনকে প্রলুব্ধ করা যাবে। সুন্দরী ইরিনার আনন্দ সঙ্গ পেতে রাসপুতিন মরিয়া হয়ে উঠবেন। তারা, হত্যার জন্য বন্ধুক ব্যবহার করতে পারত কিন্তু ফেলিক্সের বাসার পাশেই পুলিশ ফাঁড়ি থাকায় তারা গুলি করে হত্যা করার হঠকারী সিদ্ধান্ত পরিবর্তন করে।
**যেভাবে খুন করা হয় রাসপুতিনকে**
নভেম্বরের শুরুর দিকে ফেলিক্স তার ঘনিষ্ঠ মিত্র ড.
মারিয়া গলোভিনার সাথে দেখা করেন বুকের ব্যথার উপসর্গের কথা বলে। তিনি গলোভিনাকে বলেন, এই বুকের ব্যথা কোনো ঔষধ আর চিকিৎসায় উপশম হচ্ছে না। তখন, ড.মারিয়া তাকে পরামর্শ দেন দেরি না করে রাসপুতিনের সাথে সাক্ষাত করতে। ফেলিক্স এই উত্তরের প্রতীক্ষা করছিলেন, তিনি জানতেন মারিয়া এই কথা বলবেন।
অতঃপর ফেলিক্স মারিয়ার সদুপদেশ বা সুপারিশে গেলেন রাসপুতিনের সাথে দেখা করতে। রাসপুতিন আর ফেলিক্সের কয়েকবার দেখা সাক্ষাৎ এর পর তাদের বন্ধুত্ব নিবিড় হয়। তবে, ফেলিক্স রাসপুতিনকে পরামর্শ দেন কেউ তাদের এই বন্ধুত্বের কথা যেন জানতে না পারে। রাসপুতিনও এতে সায় দেন আর কথা ঠিক হয় যে, তিনি ফেলিক্সের প্রাসাদে পিছনের সিড়ি দিয়ে যাতায়াত করবেন সবসময়। সেখানে, বেজমেন্ট বা নিচতলায় দেখা করবেন। তবে, অনেকেই সেসময় তাদের এই গোপন সাক্ষাতের অভিসন্ধিকে সমকামিতার নাম দিয়েছিল। অনেকসময় আমরা সত্যকে ভ্রম আর ভ্রমকে সত্য বলে মনে করি।
এভাবে বন্ধুত্বের এক পর্যায়ে, ফেলিক্স রাসপুতিনকে তার পরমা সুন্দরী স্ত্রী ইরিনার ক্রিমিয়া হতে আগমণের কথা জানায় এবং ডিসেম্বরের ১৬-১৭ তারিখে তার সাথে দেখা করার ইচ্ছা জানায়। অতএব, ঠিক করা হলো ওইদিন রাত ১২টায় ইরিনার সাথে রাসপুতিন দেখা করবে। এও ঠিক করা হলো যে ফেলিক্স তার পিকাপে করে রাসপুতিনকে তার বাসা থেকে প্রাসাদে নিয়ে যাবেন।
কয়েক মাস ধরেই মৃত্যভয়ে দিন কাটাচ্ছিলেন রাশপুতিন। আসন্ন বিপদ সম্পর্কে বোধ হয় তার ষষ্ঠ ইন্দ্রিয়ে জানা হয়ে গিয়েছিল। লোকজনকে বলে বেড়াতেন তার মৃত্যুর কথা। বলতেন কেউ তাকে হত্যা করবে-অপঘাতে মারা যাবেন তিনি। এগুলা নিশচয় অপলাপ বা সন্দেহ ছিল না, তখন অনেকেই তাকে সাবধান করেছিল উদ্ভুত পরিস্থিতিতে বাসা থেকে কম বের হতে। কিন্তু, নারীলোভী রাশপুতিন তার সহজাত কুপ্রবৃত্তি থেকে মুক্ত হতে পারেন নি- ছুটে চলেছেন তার অবধারিত মৃত্যু থেকে।
![]() |
| নিকোলাস ও আলেকজান্দ্রা। |
*মৃত্যুঞ্জয় রাসপুতিন**
প্রাসাদে যাবার পরেই তাকে ফেলিক্স খোঁশগল্পে মাতিয়ে রেখেছিল। কথা মত রাসপুতিন কাউকেই তার এখানে আসার কথা জানান নি কিন্তু সেদিন কি যেন মনে করে তার কন্যাকে জানিয়ে এসেছিলেন।
ফেলিক্স তাকে আপ্যায়ন করেছে দামী মদ আর পেস্ট্রি। দুটিতেই মেশানো ছিল বিষাক্ত সায়ানেড। কিন্তু বাধ সাধলেন রাসপুতিন। তিনি অস্বীকৃতি জানালেন কিছু পানাহার করতে! ফেলিক্স পড়লেন দুঃশ্চিন্তায়। কিন্তু যেভাবেই হোক তাকে যে এগুলা খাওয়াতে হবে! তিনি চিন্তিত হয়ে বারবার উপরের তলায় তার বাকি সহযোগীদের সাথে কথা বলতে যান৷ তারাও, চিন্তিত হয়ে পড়ে। সবাই পরামর্শ দেয়, রাসপুতিনকে গল্পে মশগুল করে গল্পের ছলে মদ পান করাতে।
এদিকে রাসপুতিন বারবার ইরিনার কথা জিগ্যেস করছিলেন আর ফেলিক্স তাকে বুঝাল যে ইরিনা অন্যান্য অতিথিদের আনন্দ সঙ্গ দিতে ব্যস্ত, সে পাঠ চুকালেই তিনি নিচে নামবেন। ঘন্টা দুয়েক পরে কক্ষে রাখা গিটার বাজাতে বাজাতে রাসপুতিনও দুয়েক চুমুক ধীরে ধীরে মদের গ্লাসে দিতে শুরু করেন আর পেস্ট্রিও খেতে আরম্ভ করলেন। কিন্তু সবটুকু খাওয়া সত্ত্বেও ফেলিক্স ও তার সহযোগীরা দেখল তার মধ্যে বিষের কোনো প্রতিক্রিয়াই হচ্ছে না! একি, বিষও এই রহস্যময় গুরুকে ছুঁতে পারে না! উনি কি মৃত্যুঞ্জয়ী নাকি?! চিন্তার রেখা ফুটে ওঠল ষড়যন্ত্রকারীদের ঘর্মাক্ত কপালে!
অবশেষে তাদের মধ্যে থেকে একজন তাকে গুলি করল। কিন্তু তারপরও তিনি উঠে পড়লেন যেন কিছুই হয় নি। সবাই তাকে ধরপাকড় করে মারতে লাগল কিন্তু তাতেও কিছু যায় আসে না এ বিশালদেহী শক্তিবান মানুষের! পরপর, ষোলটি গুলিও যাকে কাঁবু করতে পারে নি তিনি হলেন এই অদ্ভুত মানুষ রাশপুতিন! কি ছিল তার রহস্য তা আজও ভাবিয়ে তুলে বিদুষীদের!
কিন্তু এতগুলো আঘাতের পরে খানিকটা নিস্তেজ হয়ে পড়া রাসপুতিনের শরীরটা মোটা কম্বলে পেঁচিয়ে গাড়ি করে বরফ গলা নদীতে ফেলে দিল দুষ্কৃতিকারীরা! তখনও নড়াচড়া করছিলেন রাসপুতিন!
তার মৃত্যু নিশ্চিত করে আনন্দ উৎসবে মেতে উঠল খুনিরা। বহু বছর পরেও, রাসপুতিনের ময়নাতদন্তে বের হয় যে তিনি বুলেট বা বিষে মারা যান নি, মারা গিয়েছেন হাইপোথার্মিয়ায়, অতিরিক্ত ঠান্ডায় বরফ শীতল পানির প্রবাহের জন্য! এবং এই ঠান্ডায়ও যেখানে সাধারণ মানুষ মারা যেতে যত সময় নেয় তারচেয়েও বেশি সময় নিয়েছেন তিনি, মানে ঐ বরফ শীতল পানিতেও তিনি বেঁচে ছিলেন অনেকক্ষন!
**কেন বিষ রাসপুতিনের শরীরে ক্রিয়া করে নি?!**
রহস্যময় ব্যক্তি ছিলেন রাসপুতিন। সম্মোহনের সবকটি ছলাকলা ছিল তার নখদর্পনে। করতেন ব্লাক মাজিকও। অতিরিক্ত মদ্যপ এই ব্যক্তি পান করতেন বিভিন্ন প্রাণীদের রক্ত ও বিষ! এগুলো নাকি তার শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা ও যৌনশক্তি বাড়াতে সহায়ক ছিল! তাই তো, পটাশিয়াম সায়ানেডের মত বিষেও কিছু হয় নি তার! এইধরণের বিষে তার শরীর অভ্যস্ত ছিল এবং অনেকেই মনে করেন তার এহেন অদ্ভুত খাদ্যাভাসের জন্যই তিনি ছিলেন এতটা শক্তিবান ও পরাক্রমশালী! তার অদ্ভুত নীলচে চোখের চাহনীও ছিল রহস্যময়, মুহুর্তেই জাদুর মত সম্মোহন করতে পারত নারীদের!
কিন্তু মৃত্যুর পরও যেন দিব্যি অম্লান রয় তার প্রভাব। সত্য হলো তার ভবিষ্যত বানী। তিনি বলেছিলেন, যদি তার মৃত্যু হয় তবে তার মৃত্যুর সাথে ধসে পড়বে রাশিয়ার জারতন্ত্রের ভিত! এবং সত্যি তাই হলো! এরপর, সপরিবারে নিহত হোন জার দ্বিতীয় নিকোলাস ও তার সভাসদেরা ক্ষমতা হারায়! এরপর, মাদার রাশিয়ার ইতিহাসের ছকে ক্ষমতার রোদ বদল হয় – শুরু হয় অবিসংবাদি নেতা আলেকজান্দার কারেনেস্কি হতে লেনিনের যাত্রা! জারতন্ত্র থেকে সাংবিধানিক পথচলা।
(চলবে)।
লেখিকাঃ ফারহীন ন্যান্সি।
farheenancy@gmail.com






