সোভিয়েত ইউনিয়ন এক ভাঙা গড়ার ইতিহাসের নাম। এ যেন প্রাচীন গল্পের মত এক রাজার দেশঃ
বিশাল সাম্রাজ্য! সেই রাজা বিশাল সাম্রাজ্য গঠন করেছেন বিভিন্ন খন্ড যুদ্ধের মাধ্যমে, একত্রিত করেছেন বিজিত অঞ্চল গুলোকে! গঠন করেছেন এক বিশাল সাম্রাজ্য, আমৃত্যু থাকবেন ক্ষমতায়, বিশ্ব শুনবে সে সাম্রাজ্যের দাপট আর সমৃদ্ধির কথন! কিন্তু এ বিশালতাই যেন হয়ে পড়ে সম্রাটের দুর্বলতার কারন! রাজার উত্তরাধিকারিরা রাজার মৃত্যুর পরে হিমসিম খায় সে সাম্রাজ্যকে সামলাতে! এভাবেই যুদ্ধ বিগ্রহ, দমন পীড়নে অর্জিত সে সাম্রাজ্যে বাঁজতে থাকে ভাঙ্গনের সুর! অথর্ব রাজার ধরাশয়ী হোন বিপ্লবীদের লৌহ কঠিন করাতলে, বাধ্য হোন মসনদের গদি ছাড়তে!
বিদ্রোহীরা জয় করে একের পরেক অঞ্চল আর কিছু অঞ্চল ঘোষনা করে স্বাধীনতা। এভাবে ভেঙ্গে পড়ে এক বিশাল সাম্রাজ্য! পরিনত হয় টুকরো টুকরো খন্ডে বা স্বাধীন দেশে!!
চিরাচরিত গল্প হলেও সোভিয়েত ইউনিয়নের বেলায় এটা সত্য! আসুন আজ জেনে নেই সেই বিশাল সাম্রাজ্যের কথাঃ তার উত্থান- পতনের ইতিবৃত্ত এক শতকের উপকথা!
***জার দ্বিতীয় নিকোলাস এর পতন***
শত শত বছর ধরে রুশ সাম্রাজ্য শাসিত হত রুশ জার বা রুশ সম্রাটদের হাতে। তৃতীয় ইভান সুইডিশ আর পোলিশদের বিপক্ষে যুদ্ধ করে রুশ সাম্রাজ্যের ভিত্তি মজবুত করেন। মূলত সেখান থেকেই রুশদের সাম্রাজ্যবাদী চিন্তাভাবনা অগ্রসর হতে থাকে, লেখা হয় এক বিপ্লবময় ইতিহাসের গাঁথা।
রাজতন্ত্র তখন বিশ্বের অনেক দেশে চালু থাকলেও রুশদের সাম্রাজ্য ছিল তিন মহাদেশ বিস্তারিয়া৷ ইউরেশিয়া, উত্তর আমেরিকা, ইউরোপ -তিন মহাদেশেই ছিল রুশদের আধিপত্য। এটি ছিল তৃতীয় বৃহত্তম সাম্রাজ্য যা শাসিত হয়েছিল বেশ কিছু জারদের দ্বারা। রুশদের নিজেদের সাম্রাজ্য টিকিয়ে রাখতে লড়তে হয়েছিল অনেকের সাথে- মোঙ্গলদের আক্রমন প্রতিহত করেও মোকাবিলা করতে হয়েছে সুইডিশ, পোলিশ, লিথুয়ানিয়ান শাসকদের। এমনকি নেপোলিয়ন এর আধিপত্য রুখে দিতে হয়েছিল যাতে এই অঞ্চলে নেপোলিয়ন আগ্রাসন চালাতে না পারে!
রুশদের মঙ্গোলিয়ান প্রভাব থেকে স্বাধীনভাবে বাঁচার, একক জাতিসত্ত্বা গড়ার স্বপ্ন দেখিয়েছিলেন গ্র্যান্ড ডিউক ইভান। তারই বংশধর তৃতীয় ইভান। ১৫৩৩ সালে ক্ষমতায় আসেন তৃতীয় ইভান এবং ১৫৪৭ সাল থেকে প্রচলন করেন ‘জার’ শব্দটি। তিনি রুশ সাম্রাজ্যের ভিত্তি পাকা করতে যুদ্ধ করেন সুইডিশ আর পোলিশদের বিরুদ্ধে। উচ্চাবিলাষি এ শাসক সাম্রাজ্যে যোগ করেন নতুন রাজ্যঃ সাইবেরিয়া। তার পরে কখনও কখনও কোনো জার এনেছেন সাম্রাজ্যে শান্তি, কখনও বা কেউ এনেছে চরম অরাজকতা বিশৃঙ্খলা।
যেসমস্ত জারেরা রুশ সাম্রাজ্যের অবকাঠামোগত উন্নোয়ন সাধিত করেছিল আর বেশ কিছু সংস্কার নিয়ে এসেছিলেন তাদের মধ্যে অন্যতম ছিলেন পিটার দ্য গ্রেটের এই উত্তরসূরী ঃ ১৬ বছর বয়সী তরুন জার মিখাইল রোমানভ যিনি ছিলেন অপ্রতিরোধ্য মনোভাবের অধিকারী ও প্রত্যুৎপন্ন সম্রাট।তিনি শত্রুপক্ষের সাথে বিরোধ মিটিয়ে রাজ্যে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনেন। শাসনকার্যের সুবিধার জন্য সাম্রাজ্যকে ভাগ করেন এবং সেনাবাহিনীকে ঢেলে সাজান যেন তারা হয় শৌর্য বীর্যে অমিতাভ!
কিন্তু সেই গৌরবজ্জ্বল দিনও ফুরিয়ে যায়। বসন্তের পরেই যেমন শীত আসে আর সোনালি দিনের পরে মেঘলা আকাশ তেমনি রুশ সাম্রাজ্যের আসমানের দ্রাঘিমায় দেখা মিলে অরাজকতার রংধনু! জার দ্বিতীয় নিকোলাসের শাসনামল ছিল তেমনি দুর্বিষহ। ১৮৯৪ সালে তৃতীয় আলেকজান্ডারের পরে ক্ষমতার মসনদে আসীন হোন দ্বিতীয় নিকোলাস। ততদিনে জনমনে ক্ষোভের রোষানল জ্বলছিল দাউ দাউ করে। বিদ্রোহী আর বিপ্লবীরা একে একে জড়ো হতে থাকে বিধির আপন ছকে। দাবার সৈন্যরা সম্মুখে এগিয়ে যাচ্ছিল প্রতিপক্ষের দুর্গে আঘাত হানতে। কারন ছিল তার পূর্বসূরি আলেকজান্ডারের সার্ফ প্রথা।কৃষকদের ক্ষোভকে পুঁজি করে বিপ্লবীরা তৈরি হতে লাগল জার বিরোধী আন্দোলনের জন্য। এই প্রথার ত্রুটিগত ব্যবস্থাপনা ততদিনে তৈরি করেছিল বিশাল এক সংকট আর ক্ষমতার শুন্যতা। প্রকৃতির নিয়মে শুন্যস্থান কখনও ফাঁকা থাকে না। তাই তো অবিলম্বে জারদের দুর্বল শাসনের ফাঁকা কোটরে স্থান করে নিল বিপ্লবীদের অনির্বাণ তেজের আগুন যা ভস্ম করে দিয়েছিল জারদের অপশাসন। তাছাড়াও দ্বিতীয় নিকোলাস সামরিকভাবে উচ্চাবিলাষী ছিলেন।
ক্ষমতার দাপটে অন্ধ নিকোলাস নিজ দেশের দুরবস্থার তোয়াক্কা না করে, জনমনের অবস্থা বুঝতে না পেরে জাপানের সাথে এক অসম যুদ্ধে জড়িয়ে পড়েন। জাপান নিকোলাসের আগ্রাসী মনোভাব রুখে দিতে পেরেছিল পুরাদমে আর বিশ্ব দেখল এক দুর্বল জারের সামরিক জ্ঞানের স্বল্পতা! ১৯০৫ সালের এ যুদ্ধে জয়ী হয় জাপান যেটি ছিল আরেক আগ্রাসী শক্তি! এরপরই প্রায় এক দশক পরেই বেজে উঠে প্রথম বিশ্বযুদ্ধের ভেরি! জার্মানির বিশাল সেনাবাহিনীর সাথে রুশ সৈন্যরা যুদ্ধে পেরে উঠে নি আর তাই তো রুশ জাররা বাধ্য করে দেশের প্রাপ্ত বয়স্ক পুরুষদের সেনাবাহিনিতে অংশ নিতে। যুদ্ধে রুশ সৈনিকদের প্রানহানি আর চারিদিকে এত মৃত্যুতে সাম্রাজ্যের আর্থ-সামাজিক কাঠামো ভেঙে পড়ে। তার শাসনামলে দুর্নীতি, অপশাসন, অসহিষ্ণুতা, জনগনের প্রতি নির্লিপ্ততা জনরোষের মাত্রা বাড়িয়ে তুলে যা ছড়িয়ে পড়ে সাধারন কৃষক, শ্রমিক, শিক্ষার্থীদের মধ্যে। ধনী দরিদ্রের ব্যবধান অসম হারে বাড়তে থাকে আর সমাজের দলিত শ্রেণী শোষণের বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ হতে থাকে। এতে বহু জাতির এ সাম্রাজ্য বহু দলে বিভক্ত হয়ে পড়ে।
অর্থনৈতিক ভাবে পঙ্গু রুশ সাম্রাজ্যে খাদ্য সংকট তীব্র আকার ধারণ করে। জারদের অহমিকার দেয়াল পর্যন্ত পৌছাতে পারে নি ক্ষুদার্ত কৃষকদের হাহাকার! ‘ত্রীতদাশের সন্তান ক্রীতদাস হবে আর জারের সন্তান জার’ এই নীতিতে বিশ্বাসী জারদের ক্ষমতার দাপটের রক্তাক্ত হাত হত্যা করেছিল হাজার হাজার বিক্ষোভকারীকে যা আজও ইতিহাসে ‘ব্লাডি সানডে’ নামে পরিচিত। যদিও রুশদের এ নিষ্ঠুরতা নতুন নয় যা আমরা পরবর্তী ইতিহাসে দেখব যে কিভাবে বিরোধী মতকে দমন পীড়ন আর খুনের মাধ্যমে চাপা দিতে দক্ষ ছিল এ রুশ শাসকরা, যা মধ্যযুগ পেরিয়ে আধুনিক এবং উত্তরাধুনিক যুগেও একটুও পরিবর্তিত হয় নি বরং আজও সামষ্টিক চেতনায় যা রয়ে গেছে অমলিন স্মৃতি হয়ে! মুলত এই ‘ব্লাডি সানডে’ নেপথ্যে ছিল জারের পতনে এবং বলশেভিক বিপ্লবের অনুপ্রেরণা হয়েছিল হাজারো বিক্ষোভকারীর আপসহীন রক্ত!
এদিকে জারের পরিবার তন্ত্রে ঢুকে পড়ে এক অনুপ্রবেশকারী যা রাজা ও তার পরিবারের মগজধোলাই করে জনমন থেকে দূরে সরিয়ে রাখছিল আর প্রকৃত ঘটনা থেকে অবিহিত করে রাখা হয়েছিল জার দ্বিতীয় নিকোলাসকে! তিনি ও তার প্রিয় সহধর্মিণী এক ভুয়া ধর্ম গুরুর সান্নিধ্যে ভুলতে বসেছেন দেশ,কাল, সাম্রাজ্য, প্রজা, জনগন সবই। সে ভন্ড ধর্ম গুরুর নাম ছিল রাসপুতিন- যাকে নিয়ে লেখা যায় আরেক উপাখ্যান, যিনি ছিলেন জার্মানির গুপ্তচর এবং যার ইন্ধনেই জার নিতে থাকেন একের পরেক ভুল সিদ্ধান্ত! তাই রাশিয়ার ইতিহাসে রাসপুতিন এক ত্রাশের নাম। শেষমেশ সৈন্যদের মধ্যেও অসন্তোষ দেখা দিলে সৈন্যরাও ভিড় জমায় বিদ্রোহীদের আঁখড়ায়! ইতিহাস প্রত্যক্ষ করে এক অভিনব বিপ্লবঃ রুশ বিপ্লব যেখানে সৈন্য বিপ্লবী এক কাঁতারে দাঁড়িয়েছিল অত্যাচারী জারের বিরুদ্ধে। একজন সৈন্যের বন্দুক ও গুলি ছোঁড়ে নি বিদ্রোহীদের উদ্দেশ্যে বরং সে বন্দুক তাক করা হয় স্বয়ং জারের দিকে! কার্যত জার দ্বিতীয় নিকোলাস হয়ে পড়েন একা ক্ষমতাহীন-গৃহবন্দী।
(চলবে)
লেখিকাঃ ফারহীন ন্যান্সি।
farheenancy@gmail.com