![]() |
| জোসেফ স্টালিন। |
১৯১৭ সালে অস্থায়ী সরকারকে উৎখাত করে ভ্লাদিমির লেনিন যখন ক্ষমতায় আসেন তখনও রাশিয়া বিশ্বযুদ্ধে জর্জরিত। ততদিনে, বিশ্বযুদ্ধ বিরোধী মনোভাব আর হতাশা ছড়িয়ে পড়ে পুরো দেশে। তাই, জনগনের চাপে লেনিন সিদ্ধান্ত নেন বিশ্বযুদ্ধ হতে সরে আসতে এবং নিজ দেশের অবকাঠামোগত উন্নোয়নে মনোনিবেশ করতে চেয়েছিলেন।
তাই, বলশেভিকরাই প্রথম বিশ্বযুদ্ধ থেকে বেরিয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত গ্রহন করে। সেই লক্ষ্যে তারা সাক্ষর করে অত্যন্ত অপমানজনক ব্রেস্ত-লিতোভেস্ক চুক্তি যার বদৌলতে কেন্দ্রীয় শক্তিকে বিরাট একটি অঞ্চল হস্তান্তর করতে হয়।
রাশিয়া এভাবে যুদ্ধ থেকে সরে যাওয়ায় মিত্র শক্তি তার উপর অনেক ক্ষেপে যায় এবং ব্রিটেন, ফ্রান্স, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও জাপান সম্মিলিতভাবে রাশিয়ার বিভিন্ন প্রত্যন্ত অঞ্চলে হামলা চালায়। এধরণের অসহিষ্ণুতা নিশ্চয় রাশিয়া ভুলে নি আজও যার জন্য এখনো রাশিয়া একটি পশ্চিমা দেশের অংশ হবার পরও পশ্চিমা দর্শন থেকে যোজন যোজন দূরে-বিপরীত মেরুতে অবস্থিত।
তারা রাশিয়ার উপর কঠোর নৌ অবরোধ চাপিয়ে দেয়, সেইসাথে রাশিয়ার বিভিন্ন প্রদেশগুলোতে বিচ্ছিন্নতাবাদীদের প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ সাহায্য দিয়ে সোভিয়েত বিরোধী আন্দোলন সক্রিয় করে তোলে।
এরফলে, রাশিয়া জুড়ে এক ভয়াবহ গৃহযুদ্ধ শুরু হয় রেড আর্মি ও ওয়াইট আর্মির মধ্যে। রেড আর্মি ছিল বলশেভিকরা আর ওয়াইট আর্মি ছিল মেনশেভিকরা তথা বলশেভিক বিরোধী দল। যুদ্ধে লেনিনের বলশেভিকরা জিতে যায় আর তাকে শক্ত হাতে দমন করতে হয় পশ্চিমা মদদে পুষ্ট বিরোধী শক্তিকে।
কিন্তু, এ যুদ্ধে বৃহত্তর রাশিয়ার অবকাঠামো, রুশ সমাজব্যবস্থা ও অর্থনীতি পুরোপুরি ভেঙ্গে পড়ে।
এই সময়ে বিখ্যাত লেখক এইচ জি ওয়েলস তার ‘রাশিয়া ইন শ্যাডোজ’ বইতে তৎকালীন যুদ্ধ বিধ্বস্ত রাশিয়ার অবস্থা বর্ণনা করেন। তিনি বলশেভিকদের কঠোর অথচ সরল শাসক হিসেবে উল্লেখ করেন, আর রুশদের অনমনীয় ব্যক্তিত্বের ভূয়সী প্রশংসা করেন। তিনি বলেন, দুর্ভিক্ষপীড়িত রাশিয়ার যেখানে দু বেলা অন্ন যোগাড় করা মুশকিল হয়ে পড়েছিল, কাঁচামালের এত দুষ্প্রাপ্যতা ছিল,তা সত্ত্বেও বিজ্ঞানীরা তাদের পারমানবিক পরীক্ষা চালু রেখেছিল। বরং, তাদের দুঃশ্চিন্তা এই নিয়ে ছিল যে যুদ্ধ ও দুর্ভিক্ষের জন্য বিদেশি বৈজ্ঞানিক ম্যাগাজিন তাদের হস্তগত হবে না! এবং এই জন্যে তারা বহিঃবিশ্ব থেকে পিছিয়ে পড়ছে। এবং এই যুদ্ধের দামামার মধ্যেও থিয়েটার একদিনের জন্যেও বন্ধ হয় নি!
কার্ল মার্ক্সের তত্ত্বকে সম্পূর্ণ বুড়ো আঙ্গুল দেখিয়ে একটি কৃষিপ্রধান দুর্ভিক্ষ পীড়িত দেশে বিপ্লব সংঘটিত হলো যেখানে তার ভবিষ্যত বানী ছিল যে শিল্পোন্নত দেশসমূহ যেমন ব্রিটেন, ফ্রান্স, জার্মানি, আমেরিকায় এ বিপ্লব হবার কথা! তাই তো, রুশ বিপ্লবের তিন বছরের পরেও যখন এসব দেশের সমাজ ব্যবস্থা প্রভাবিত হয় নি, তখন তা রীতিমতো বলশেভিকদের মাথাব্যথার কারন হয়ে দাঁড়ায়। বিপ্লব যে ছড়িয়ে দিতে হবে দেশে দেশে! ফরাসী বিপ্লবের মত রুশ বিপ্লবকেও যে মহিমান্বিত হতে হবে!
বস্তুত, বলশেভিকরা এহেন রাজনৈতিক সারল্যে ভুলে গিয়েছিলেন যে এটি মার্ক্সের কথিত সামাজিক বিপ্লব নয় তবে রাশিয়ার কিছু বিচ্ছিন্ন ঘটনার সূত্রপাত মাত্র যা রাশিয়াকে ধীরে ধীরে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছিল তার সবচেয়ে বড় সামাজিক পতনের দিকে৷
পশ্চিমা বিশ্বে যখন সমাজতন্ত্রের বিকাশ ঘটছিল না বা বলশেভিক বিপ্লবের কোনো প্রভাব দেখা যাচ্ছিল না তখন, তারা নজর দেয় সমাজতন্ত্র বিকাশে! বিশেষ করে, এশিয়া, মধ্য এশিয়া ও ঔপনিবেশিক দেশগুলোর দিকে তারা ঝুঁকে পড়েছিল।ফলে, তারা আয়োজন করা শুরু করে বিভিন্ন সভা সেমিনার, এর মুলপাঠ ছিল কিভাবে বিপ্লব সংঘটিত হয়! বিপ্লব কি করে করতে হয়!
এতে, অনেকেই মনে করেছিলেন যে রাশিয়া পাশ্চাত্য ঘেঁষা না হয়ে প্রাচ্যে সাম্রাজ্যবাদী আগ্রাসন চালাতে পারে, যা সত্য হয়েছিলও পরে৷
তবে, এই আগ্রাসী মনোভাবই যে সোভিয়েত ইউনিয়নের কাল হয়েছিল তা জানব আমরা এর পতনের ইতিহাস থেকে। কিন্তু, তার আগে জানা প্রয়োজন এটি গঠিত হয়েছিল কিভাবে।
১৯৯১ সালে সোভিয়েত ইউনিয়ন ভেঙ্গে ১৫ টি রাষ্ট্র হবার আগে এটিও আজকে যুক্তরাষ্ট্র, চীনের মত পরাশক্তি ছিল। এখনও এর প্রভাব যে একদম নস্যাৎ হয়ে যায় নি তাও আমরা দেখব সমসাময়িক রাজনীতিতে যখন রুশ-চীনা-ইরান-তুরস্ক-পাকিস্তান-মালয়েশিয়া-ইন্দোনেশিয়া জোট ন্যাটো বিরোধী তৎপরতা চালাচ্ছে। মিয়ানমার, নেপাল, ভুটানও যে তাতে কৌশলগত অবস্থানে আছে ভারতকে কোণঠাসা করতে তাতো আর সমসাময়িক রাজনীতির অঙ্গনে অজানা নয়! এর বিপরীতে, জোট বাঁধে ন্যাটোও! প্যান প্যাসিফিক স্ট্রাটেজি তথা জাপান,ভারত, যুক্তরাষ্ট্র, অস্ট্রেলিয়াকে নিয়ে গড়ে তোলে যৌথ সংস্থাঃ কোয়াড! যা এই অঞ্চলে চীনা-রুশ প্রভাব বিরোধী এবং দক্ষিন চীন সাগরের কর্তৃত্ব নিয়ে বিরোধে লিপ্ত!
যেখানে, বাংলাদেশ এখনো নিরপেক্ষ বা নীরব দর্শকের ভূমিকা পালন করছে! যদিও, চীনের সাথে ৮,২৫৬ টি পণ্যের উপর শুল্ক মুক্ত চুক্তি সই করে বাংলাদেশ চীন মুখী হবার ইঙ্গিত দিচ্ছে অদূর ভবিষ্যতে, কিন্তু সেটিও একটি বিরাট প্রশ্নবোধক চিহ্নের সদৃশ যে দীর্ঘদিনের বন্ধু ভেবে আসা ভারতের সাথে তিস্তা,গঙ্গা, পদ্মার পানি, ফারাক্কা বাঁধ ইস্যু, ট্রানজিট ইস্যু ও ব্যবসা বাণিজ্য ও স্থলবন্দর ব্যবহার সহ নানান বিষয়ে পারস্পরিক নির্ভরশীলতার এই দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ককে এড়িয়ে বাংলাদেশ কতদূর আগানোর চিন্তা করছে, তাতো আসন্ন সময়ই বলে দিবে! তবে, চীনের সাথে তিস্তা ইস্যুতে যে বাঁধ স্থাপনের প্রকল্পের কথাবার্তা চলছে তা সত্যিই আশাপ্রদ কারন ইতোমধ্যে পার্শ্ববর্তী দেশগুলো যেমন নেপাল, মিয়ানমার এমনকি ভূটানও এই দক্ষিন এশিয় জায়ান্টের সাহায্যে ফুঁলে ফেঁপে উঠছে ও ব্যাপক অবকাঠামোগত উন্নোয়ন করে দেশের সুরত পরিবর্তন করছে।
এতেই, বুঝা যায় যে কমিউনিস্ট চীনের বন্ধু রাশিয়া(যদিও কমিউনিজমের আদর্শগত পার্থক্য আছে) এশিয় রাজনীতিতে পিছিয়ে পড়বে না বরং চীনের কাধে বন্দুক রেখেই গুলি চালাতে চাইবে।
কিন্তু বর্তমান প্রেক্ষাপটে আসার আগে আমাদের আগের শতকে যেতে হবে যখন আজকের রাশিয়া বৃহত্তর সোভিয়েত ইউনিয়ন ছিল। যার আয়তন ছিল, প্রায় ১ কোটি ২৪ লাখ বর্গ কিলোমিটার। যা পৃথিবীর আয়তনের ছয় ভাগের এক ভাগ। এই বিশাল, রাষ্ট্র গঠনের প্রক্রিয়া রুশ বিপ্লবের পরপরই ১৯১৭ সালে শুরু হয়।
রাশিয়া ও আশেপাশের সম আদর্শের রিপাকপাবলিক গুলো একত্রিত হয়ে গঠিত হতে থাকে সোভিয়েত ইউনিয়ন। পরবর্তীতে, ১৯২৪, ১৯৩৩ ও ১৯৪০ সালে যুক্ত হতে থাকে যথাক্রমে উজবেক, কাজাখ, লিথুনিয়া ও বাল্টিক রাষ্ট্রগুলো সহ অন্যান্য রিপাবলিক গুলো। এই যুক্তকরণ প্রক্রিয়া ১৯৪০ সাল পর্যন্ত চলতে থাকে এবং ১৯৪০ সালে এটি সম্পূর্ণ হয়।
কিন্তু কমিউনিজমের সামষ্টিক চেতনায় ব্যক্তিমালিকানা লোপের সাথে সাথে ব্যক্তিস্বাধীনতা নিবারণ করার যে চেষ্টা সেটাই যে এ সমাজব্যবস্থার পতন ত্বরান্বিত করে তা আর বলার অপেক্ষা রাখে না, যার জন্য গর্ভাচেভ ‘গ্লাসনস্ত’ নীতি বা খোলামেলা আলাপ করার নীতি আনতে বাধ্য হয়েছিলেন, যার জন্য সবাই সোভিয়েত শাসন বিরোধী শ্লোগান তুলতে পেরেছে ঠিক জার বিরোধী আন্দোলনের মত! আর তাতে, দ্বিতীয়বারের মত শাসনের ভিত কেঁপে উঠে সোভিয়েত ইউনিয়নের আর ভেঙ্গে যায় আদর্শের জোড়াতালি দেয়া এ বৃহৎ রাষ্ট্র; যার পেট চিরে জন্ম নেয় আরো ১৫ টি ছোট বড় রাষ্ট্র!
১৯২২ এর গৃহযুদ্ধে শেষে মাত্র দু বছর ক্ষমতায় ছিলেন লেনিন। তার অপ্রত্যাশিত মৃত্যু রাশিয়াকে শক্তিশালী রাষ্ট্রে পরিনত করার স্বপ্ন গড়া হতে বিরত করে। তিনি নাজাত পান তার বর্ণাঢ্যময় রাজনৈতিক জীবন থেকে।
তবে, কেমন হতে পারত লেনিনের রাশিয়া? তা কি আজকের রাশিয়া হতে ভিন্ন হতে পারত, সে এক অমিংমাসীত প্রশ্ন! কারন, লেনিনের পরেই ক্ষমতা গ্রহন করেন আরেক বলশেভিক বিপ্লবী নেতা, তার সহতীর্থ স্টালিন। যিনি ছিলেন লেনিনের গড়া আইডলজির স্রোতধারার বিপরীত- লেনিনবাদ বিরোধী এবং স্বৈরশাসক।
লেনিনের মৃত্যুর পর, দেশের ভেতরে ও বাইরে কমিউনিস্ট শ্রেণি সংগ্রামের আন্দোলন উদ্বুদ্ধ করা,সমাজতান্ত্রিক চিন্তা চেতনার বিকশিত করা এবং যৌথ খামার গড়ে তোলা, অবকাঠামোগত উন্নোয়ন করা শিল্পায়নের মাধ্যমে, লাল ফৌজের মাধ্যমে কমিউনিস্ট পার্টির নেতৃত্ব দেয়া- এসবই করেছেন তিনি সুপরিকল্পিতভাবে।
রাশিয়ার লৌহমানব খ্যাত স্টালিন সমাজতন্ত্র টিকিয়ে রাখতে নিয়েছিলেন একের পরেক নির্মম সিদ্ধান্ত।
অনেকের মতে, নিষ্ঠুরতার দিকে হিটলারের পরেই স্টালিনের নাম -আর তাদের মধ্যে সাদৃশ্য হচ্ছেঃ উভয়ই ছিলেন ইহুদি বিদ্বেষী।অথচ, মুদ্রার অপর পিঠে রাশিয়াকে পরাশক্তিতে পরিণত করার কারিগর এই লৌহকঠিন স্টালিনই!
যেমন নাম তেমনি কাজ এই ব্যক্তির!
স্টালিন অর্থ “ম্যান অফ স্টিল’। পার্টির দেয়া উপাধি। লেনিনের অনুপস্থিতিতে পার্টির সকল কাজ ডান হস্ত হয়ে সম্পাদন করতেন স্টালিন। তাই তো, ১৯২৪ সালে লেনিনের মৃত্যুর পর পার্টির প্রথম পছন্দ ছিল স্টালিন। ক্ষমতা লাভের পরপরই স্টালিন সোভিয়েত ইউনিয়নকে একটি কৃষিপ্রধান অনুন্নত দেশ থেকে শিল্পোন্নত দেশে পরিণত করার উদ্যোগ গ্রহন করেন। এই জন্য পঞ্চবার্ষিক মেয়াদী বিভিন্ন প্রকল্প হাতে নেন।
এমনি এক প্রকল্পের অধীনে স্টালিন দেশের সকল অর্থনৈতিক কর্মকান্ড সরকারের অধীনে নিয়ে নেয়। যেসকল ব্যবসায়ী ও ধণাঢ্য ব্যক্তিরা এর বিরোধিতা করে তিনি সকলকে বন্দী করেন। হাজার, হাজার শ্রমিক, কৃষককে জেলে ও শ্রম ক্যাম্পে পাঠানো হয় এবং সেখানে তাদের হত্যা করা হয়।
এই কারনে সোভিয়েত ইউনিয়ন প্রতিষ্ঠিত হবার পরে সেখানে দুর্ভিক্ষ দেখা দেয় ও লাখ লাখ মানুষ মারা যায়। গোয়েন্দা সংস্থা কেজিবি প্রতিষ্ঠা করে সরকারি মতামতের সাথে অসহিষ্ণু ব্যক্তি ও বিরোধীদের গুম করে হত্যা সহ, লেবার ক্যাম্পে পাঠিয়ে জোরপূর্বক শ্রম দিতে বাধ্য করেন। বাকস্বাধীনতা কেড়ে নেওয়া হয়। কেড়ে নেয়া হয় স্বতন্ত্রভাবে চিন্তা করার অধিকার।
এমনকি রাষ্ট্রকে সেকুলার করে গড়ে তুলতে ও শুধু সমাজতন্ত্রের ডগমা ও রিচুয়ালস তথা রীতি নীতি পালন করানোর জন্য, ধর্মীয় অনুভূতিতে তিনি আঘাত দেন। বন্ধ করেন ধর্মচর্চা। পশ্চিমা সংস্কৃতি চর্চাকারীদের উপরও নেমে আসে অকথ্য অত্যাচার।
নতুন সড়কগুলোর নামকরণ স্টালিনের নামে করা হয়, রাস্তাঘাটে তার প্রতিকৃতি ঈশ্বরের মত সাজানো হয়, স্থাপনাগুলো তার নামে করা হয়, এমনকি তার শাসনকালকে স্মরণীয় করে রাখতে তার অবদান সমেত বই লিখাতে বাধ্য করান স্টালিন!
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শুরু হলে, স্টালিন হিটলারের সাথে শান্তিচুক্তি স্বাক্ষর করে কিন্তু হিটলার সে চুক্তি ভঙ্গ করে ১৯৪১ সালে আক্রমণ করলে, স্টালিন বাধ্য হোন মিত্র শক্তির সাথে যুদ্ধে যোগদান করে৷
যুদ্ধে জার্মানরা রাশিয়ার শহরগুলো যখন একের পরেক এক করে দখল করতে থাকে তখন স্টালিন জার্মানদের দুর্বল করার জন্যে সেসকল শহরগুলোর খাদ্যভান্ডার ও ব্রিজগুলো ধ্বংস করে দেয়ার নির্দেশ দেন। এতে, সাধারণ জনগনও ভুক্তভোগী হয় এবং সে অঞ্চলসমূহে নেমে আসে মহামারী-দুর্ভিক্ষ।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে অন্যান্য মিত্রদেশ গুলো থেকে রাশিয়ার ক্ষতির পরিমান বেশি ছিল। যুদ্ধ শেষ হলে
স্টালিন রাশিয়াকে পরাশক্তি বানানোর নেশায় বুঁদ হোন। পারমানবিক বিজ্ঞানের দিকে বিশেষ গুরুত্বারোপ করেন।
১৯৪৯ সালে স্টালিনের শাসনাকালে রাশিয়া সর্বপ্রথম পারমানবিক বিস্ফোরণ ঘটায়। এর পর, থেকেই যুক্তরাষ্ট্রের সাথে স্নায়ুযুদ্ধের সূত্রপাত হয়। স্টালিনের শাসনামলে রাশিয়া পারমানবিক শক্তির দেশ হিসেবে পরিগনিত হয় এবং দেশে ব্যাপক শিল্প উন্নয়ন সাধিত হয়। যার জন্য, সার্বিকভাবে রাশিয়ার উন্নতি হয়। কিন্তু এই স্টালিনের আমলে মানবতার সূচক মেমে আসে একদম শূণ্যের কোঠায়। বিভিন্ন সময়ে, শ্রম কারাগারে প্রাণ দেন ত্রিশ লাখের বেশি রাশিয়ার জনগন। হয়ত, রাশিয়ার উন্নতির কারিগর এই শ্রম দেয়া হতভাগা কারাবন্দী শ্রমিকরাই!
তাই, প্রশ্ন জাগে কমিউনিজম কি আসলেই শ্রমিকের মুক্তি?! মজলুমের কন্ঠের বিজয়? শ্রমিকের বিপ্লবের সফলতা নাকি শ্রমিকদের ব্যবহার করে আরো ক্ষমতাবান হয়ে উঠেছে কিছু মুষ্টিমেয় লোকজন?!
মার্ক্স কি শ্রমিকদের নেতৃত্বে যে শোষণহীন সমাজের স্বপ্ন দেখিয়েছিলেন, তার প্রতিচ্ছবি কি এমন?!
ঠিক কতটা মার্ক্সিস্ট স্টালিন, লেনিনেরা.. আর ঠিক কতটা বুঁর্জোয়া তারা? নাকি, আদতে তারা মার্ক্সিজমের লেবাসে মুড়ানো বুঁর্জোয়া লিডার?! মার্ক্সিজমের লেবাসধারণ করেছেন ও বুলি আওড়েছেন, শুধুমাত্র ক্ষমতা কুক্ষিগত করবার জন্যে?!
এহেন, দ্বৈতনীতিই কি শেষ পর্যন্ত ডেকে নিয়ে এসেছিল সোভিয়েত ইউনিয়নের ভাঙ্গন?!
বস্তুত, ৫ই মার্চ, ১৯৫৩ সালে স্টালিনের মৃত্যুর পরে নিকিতা ক্রুশ্চেভের ক্ষমতা গ্রহনের পরে আমরা দেখতে পাব সংস্কারের রাশিয়া যা আসলে, রাশিয়ার পরাশক্তি হবার পথ রোধ করেছিল। কারাগারে ইনডেঞ্চারড শ্রমিকদের বলি বন্ধ করা হলেও সমাজতন্ত্রের যে সুবাতাস বয়েছিল সেদেশে তার মোড় ঘুরিয়ে দেয়া হয় পুঁজিবাদী অর্থনৈতিক ব্যবস্থার দিকে!এই নতুন সংস্কার, পুঁজিবাদের মিশেল কি আদৌ রাশিয়ার ভাগ্য পরিবর্তন করতে পেরেছিল?!
নিকিতা থেকে শুরু করে গর্ভাচেভ হয়ে বরিস ইয়াৎসেন, মাদারল্যান্ডের বিদ্রোহের হুংকার তাদের বাধ্য করেছিল সংস্কার করতে, আমুল পরিবর্তন আনতে।
তাই,স্বভাবতই প্রশ্ন জাগে বর্তমানে কয়েক দশক ধরে ক্ষমতায় থাকা পুতিন কি পেরেছে, পূর্বের সোভিয়েতভুক্ত দেশসমূহে হৃত গৌরব ও প্রভাব ফিরিয়ে আনতে?
(চলবে ইনশাআল্লাহ)।
লেখিকাঃ ফারহীন ন্যান্সি।
সমাজবিজ্ঞান বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।
