সাল ১৯০৪। মানচুরিয়া আর কোরিয়াতে আধিপত্য বিস্তার করা নিয়ে জাপান ও রুশ সাম্রাজ্যের মধ্যে যুদ্ধ শুরু হয়। যুদ্ধে রুশরা করুনভাবে পরাজিত হয়।
এমনিতেও জারদের অপশাসনে আর দুরাচারে প্রজারা অতিষ্ঠ হয়ে উঠেছিল। পর্যাপ্ত খাদ্য শস্য উৎপাদন করলেও, জারদের অন্যায় করারোপ আর দখলদারিত্বের জন্য দেশে তীব্র খাদ্য সংকট দেখা দেয়। সেই সাথে আছে গোপন পুলিশ বাহিনীর তান্ডব,গুম,হত্যা অন্যায়, কারাগারে প্রেরণ, অবিচার, শোষণ, বঞ্চনা!
নিপীড়িত, নিগৃহীত, নির্যাতিত জাতির মনে তখন আশার আলো জাগিয়েছিল কতিপয় রুশ লেখক ও মার্ক্সবাদী সাম্যবাদের চিন্তাচেতনা।রাশিয়ার জার প্রথম নিকোলাসের দমন পীড়নের নীতি, অবরোধ ও স্বাধীন মত প্রকাশের তীব্র বাধার পরেও তলস্তয়, চেখভ, গোর্কি, পুশকিন, তুর্গানেভ প্রমুখ লেখকরা তাদের অসাধারণ লেখনীর মাধ্যমে জাতিকে স্বৈরাচারের আসল প্রতিচ্ছবি দেখাতে শুরু করে। ততদিনে মার্ক্সিজম আর বুকানিনের নৈরাজ্যবাদ ব্যাপক জনপ্রিয়তা লাভ করে। এই জন্যই বোধ হয় সমাজবিজ্ঞানী হেবারম্যাস বলেছেন, নির্যাতিত নিগৃহীত জনগনই মুক্তির পথ খুঁজতে থাকে, সে অন্বেষণে খোঁজ মিলে ইমানসিপেটারি নলেজের তথা শোষণ, অবজ্ঞা থেকে মুক্তিলাভের জ্ঞান- আর জ্ঞানমাত্রই তা থেকে বেরিয়ে যাওয়ার পথ আবিষ্কার করা!
নিপীড়িত কৃষক, শ্রমিক, শিক্ষার্থিরা এক হতে থাকে একই আদর্শের ছায়াতলে.. রুশীয়করণের বিরুদ্ধে দাঁড়ায় সংঘবদ্ধ শক্তি– বিভিন্ন জাতের সংমিশ্রনে গড়ে উঠা সাম্রাজ্য মুক্তি খুঁজতে থাকে নৈরাজ্য থেকে। আর্মেনীয়, তুর্কি, আজারবাইজানীয়, ইউক্রেনীয়, ফিন, জর্জিও, পোলিশরা বুঝতে পারে তাদের স্বাতন্ত্র্য আর রুশ সংস্কৃতির সাথে তাদের পার্থক্য!! তারা যে কেবলি উপনিবেশ সেটা তারা অচিরেই বুঝতে পারে। তাই তো, প্রথমে বেরিয়ে পড়ে পোল্যান্ড স্বাধীন দেশ হিসেবে। পরবর্তীতে সে গল্পেও আসব আমরা ইতিহাসের প্রয়োজনে।
স্বৈরাচারী জারতন্ত্র ইচ্ছামত আইনসভা ডুমা ভেঙ্গে দেয়ার আবার গড়ে তোলার নাটক জারি করতে লাগলেন এবং
একের পরেক দুঃশাসনের নীতি প্রবর্তন করতে থাকেন। একদিকে জারদের পৃষ্ঠপোষকতায় অভিজাততন্ত্রের দ্রুত বিকাশিত হতে থাকে অন্যদিকে গরীবেরা আরো গরীব হতে থাকে! কৃষক বাস্তুহারা হতে থাকে, শ্রমিক ছিন্নমূল হয়!
তৎকালীন রাশিয়ার ৮০ ভাগ ছিল ভূমিদাশ বা সার্ফ। এই সার্ফদের কোনো ব্যক্তিমালিকানা ছিল না, সেই সাথে ছিল উচ্চ মুল্যের কর আর চাপিয়ে দেয়া নিপীড়ন। তাদেরকে সমাজে সবচেয়ে নিচু স্তরের মানুষ মনে করা হতো এবং দাসের ন্যায় দুর্ব্যবহার করত সমাজের এলিট শ্রেণি।
১৮৬১ সালে জার প্রথম আলেকজান্ডার ভূমিপ্রথা উচ্ছেদ করেন ঠিকই কিন্তু কৃষকের অবস্থার কোনো পরিবর্তন হয় নি! বরং ক্ষমতার রদবদল হয়েছিল শুধু! শোষক পায় নতুন চেহারা- জারদের বদলে প্রতিষ্ঠিত হয় ‘মীর’ নামক অঙ্গ প্রতিষ্ঠানের! মীরের তত্ত্বাবধানে কৃষকরা তাদের জমি ফিরে পায় ঠিকই কিন্তু দারিদ্র্যের দুষ্ট চক্রে আক্রান্ত হয়ে; হয় জমি জমিদারদের কাছে বিক্রি করেছে নাহয় বন্ধক দিয়ে তাদের দাসে পরিণত করা হয়েছে! নয়ত শহরে নতুন শিল্পকারখানায় শ্রমিক হয়েছে!! এ যেন চিরায়ত বিধান- যার কোনো পরিবর্তন নেই, সংস্কার আছে তাতে দলিত শ্রেণীর কোনো লাভ নেই, বরং নতুন নতুন অভিজাত তৈরি হতে থাকে! এছাড়াও তাদের বাধ্য করা হয় সেনাবাহিনীতে যোগ দিতে! এতে, তারা জমি ত পেলই না উপরন্তু জীবন খোঁয়াতে হল জারদের যুদ্ধংদেহী আয়েশি মনোভাবের খাঁমখেয়ালিপনায়!
জারদের নিজের সাম্রাজ্যের লোকদের দুরাবস্থা নিয়ে কোনো মাথাব্যথা ত ছিলই না উল্টো তাদের মাথায় চাপে আগ্রাসী সাম্রাজ্যবাদী চেতনার নেশা! রবীন্দ্রনাথ হয়ত ঠিকই বলেছিলেন,
” এ জগতে হায় সেই বেশি চায় যার আছে ভুরি ভুরি, রাজার হস্ত করে সমস্ত কাঙালের ধন চুরি।”
এভাবেই কৃষকদের মধ্যে অসন্তোষ বাড়তে থাকে। সেই সাথে, শ্রমিকরাও তাদের ন্যায্য পাওনা থেকে বঞ্চিত হতে থাকে। মানবেতর জীবযাপন করতে থাকে অলিতে গলিতে বস্তিতে!
ইউরোপের অন্যান্য অংশ থেকে রাশিয়া কিছুটা অনগ্রসর হলেও তখন বেশ কিছু শিল্প প্রতিষ্ঠান গড়ে উঠেছিল যার বেশির ভাগেরই মালিক ছিল অভিজাতরা আর বিদেশিরা।
অল্প বেতন, শোষণ, দুর্বিষহ জীবনে দিনানিপাত করতে করতে শ্রমিকেরা বুঝে গিয়েছিল জারতন্ত্রে তাদের জন্য কোনো মঙ্গল নেই! তারা একীভূত হতে থাকে আর সঞ্চিত হতে থাকে দীর্ঘদিনের পুঁজিকৃত ক্ষোভ।
কৃষক শ্রমিক হয়ে যায় ভাই ভাই, জার-অভিজাতদের পতন চাই, এমন শ্লোগানে মুখরিত হতে থাকে রাজপথ! সড়ক! ততদিনে বিদেশি ঋনগ্রস্ত রুশ জারের যুদ্ধবিগ্রহে, বিদেশি কাঁচামাল আমদানি সহ শিল্পে ঋনের পরিমান দাঁড়ায় ৫৪৯৫ মিলিয়ন ডলার!
প্রথম বিশ্বযুদ্ধে রুশ সাম্রাজ্যের মেরুরুজ্জ ভেঙ্গে যায়। অর্থনৈতিক মহামন্দা নিরসনে কোনো গঠনমূলক পদক্ষেপ নিতে অপারগ জারদের জন্য দেশে দেখা দেয় তীব্র খাদ্য সংকট আর অবদমন । জনমনের রোষানল এবার জ্বলন্ত লাভার মত উপচে পড়ে শাসকের গালিচায়!
বিপ্লবের ডাক দেয় তারা আর রক্তের বন্যায় কাঁপিয়ে দেয় জারদের ভিত। ১৯০৫ সালের ২২ শে ফেব্রুয়ারী রবিবারে হাজার হাজার ঐক্যবদ্ধ শ্রমিকের উপর নেমে আসে বুলেটের বর্ষণ, ঝাঁঝরা করে দেওয়া হয় তাদের নিথর শরীর। সেদিন ফাদার গাপনের নেতৃত্বে বিক্ষোভকারীরা জমায়েত হয় অত্যাচারী জারদের বিরুদ্ধে।সেদিনের হাজার চারেক মৃত্যু বিফলে যায় নি। শহীদের রক্ত বৃথা যায় নি- গোড়াপত্তন হয় রুশ বিপ্লবের।
এরপরের ইতিহাস শুধুই বিপ্লবের আর শ্লোগানের। যুদ্ধের আর দমন পীড়নের। তার মধ্যেই এগিয়ে গেছে রাশিয়া। পরিনত হয়েছে বিশ্বশক্তিতে। নিজেকে শেষ করেও পুনঃনির্মাণ করেছে প্রতিবার। তাই হয়ত এটা বলা ভুল হবে না যে রুশ বিপ্লব এখনো চলমান!! রাশিয়ার ইতিহাস আবারো লেখা হবে যতবার শোষকের শাসন থাকবে ঠিক ততবার! বিদ্রোহ পরবর্তী সময়ে
,স্বৈরাচারী জার বাধ্য হোন ডুমা বা রাষ্ট্রীয় পরিষদ গঠন করতে যা ছিল কেবলি লোকদেখানো বা নামমাত্র!
** রুশ বিপ্লবের সূচনা**
রুশ বিপ্লব ১৯১৭ সালে ঘটে যাওয়া দুটি বিপ্লবের মিলিত নাম। প্রথম বিপ্লব হয় ফেব্রুয়ারিতে যার মাধ্যমে জার নিকোলাসকে উৎখাত করা হয় আর দ্বিতীয়টিতে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারকে উৎখাত করে বলশেভিকরা ক্ষমতা গ্রহন করে।
প্রথম বিশ্বযুদ্ধের ঘনঘটায় রাশিয়ার অবস্থা তখন থমথমে। অভাবে অনটনে দিনানিপাত করা জনগনের মধ্যে ক্ষোভ আর অসন্তোষ প্রকট আকার
ধারণ করে। খাদ্য সংকটের প্রতিবাদে ১৯১৭ সালের ৮ ই মার্চ (জুলিয়ান ক্যালেন্ডার অনুযায়ী ২৩ শে ফেব্রুয়ারী তখন রাশিয়ার ক্যালেন্ডার ১৩ দিন পিছানো ছিল) হাজার হাজার নারীরা রাস্তায় নেমে আসে। পরদিন তাদের সাথে যোগ দেয় আপামর সাধারণ জনগন। যোগ দেয় শ্রমিক জোট এবং ছাত্র জোট। যোগ দেয় জারের সৈন্যরাও! এমতাবস্থায় জার এত চাপ সামলাতে না পেরে ১৫ মার্চ ক্ষমতা ত্যাগ করে। মাত্র কয়েকদিনের আন্দোলনে পতন ঘটে ৩০০ বছরের জার শাসনের!
জার পরবর্তী অন্তর্বর্তীকালীন সরকার গঠন করে ডুমার গনতান্ত্রিক দলের প্রিন্স জর্জ লুলাভ। কিন্তু তাদেরও কোনো মাথাব্যথা ছিল না ক্ষুদার্ত জনসাধারণ নিয়ে! তারাও যুদ্ধপরবর্তী রাশিয়া নিয়ে কোনো কার্যকরী পদক্ষেপ নিতে পারেন নি। শুধু ক্ষমতার হাত বদল হয়েছিল আর কিছুই না।
এমনতরো অবস্থায় বলশেভিক নেতা লিয়ন ট্রটস্কি প্রথম বিশ্বযুদ্ধ থেকে রাশিয়ার নাম প্রত্যাহারের দাবী জানালে তার দাবী নাকচ করে দেওয়া হয়, এতে আরো ক্ষিপ্ত হয়ে উঠে জনগন। ১৯১৭ সালের ৩ রা এপ্রিল ১০ বছরের নির্বাসিত জীবন শেষ করে সেন্ট পিটার্সবার্গে আসেন রুশ বিপ্লবের মহানায়ক ভ্লাদিমির লেনিন। লেনিন ও তার বলশেভিক দল জনগনকে এই অস্থায়ী সরকারের বিরুদ্ধে ক্ষিপ্ত করে তোলে ব্যাপক প্রচারণার মাধ্যমে। এরপর, ১৯১৭ সালের ৭ নভেম্বর, (জুলিয়ান ক্যালেন্ডার অনুযায়ী ২৫ শে অক্টোবর) এই অস্থায়ী সরকারের বিরুদ্ধে অভ্যুত্থান পরিচালনা করেন স্বয়ং লেনিন। মাত্র ১০ দিনের মাথায় এই অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের পতন ঘটে আর বলশেভিক পার্টি নেতৃত্ব গ্রহন করে। লেনিন হন রাষ্ট্রপ্রধান। তার শাসনামল ছিল ১৯১৭-১৯২৪ সাল পর্যন্ত যার পুরোটাই গেছে গৃহযুদ্ধ ও গৃহযুদ্ধপরবর্তী সংস্কারের মধ্যে দিয়ে। রেড আর ওয়াইট আর্মির এই গৃহযুদ্ধে রেড আর্মিরা জয় লাভ করে আর যুদ্ধ শেষ হয় ১৯২২ সালে। এরপর মাত্র, দুই বছর বেঁচে ছিলেন লেনিন। ১৯২৪ সালে তার মৃত্যুর পরে সেন্টপিটার্সবার্গের নাম লেনিনগ্রাদ রাখা হয় তার সম্মানার্থে!
যদিও সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের পর ১৯৯১ সালে আবার তার পূর্ব নামে বহাল হয় রুশ বিপ্লবের সূতিকাগার ঐতিহাসিক সেন্টপিটার্সবার্গ!
রেড আর্মির বিজয় পরবর্তী সোভিয়েত ইউনিয়নের উত্থান সহ এর পতনের মধ্যে নিহিত আছে দীর্ঘ অর্ধশতাব্দীর
ইতিহাস! যার রেষ ধরে চলছে এখনো পুরোনো শক্তি দাপট অর্জনের প্রয়াস। হয়তবা সফল নাকি ব্যর্থ তা দেখা যাবে গুটি কয়েক বছর পরে করোনা পরবর্তী সময়ের রাজনীতিতে!
লেখিকাঃ ফারহীন ন্যান্সি।
সমাজবিজ্ঞান বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।