প্রতিটা বিপ্লব ইতিহাসের বিপ্লব! প্রতিটা যুদ্ধ হয় ইতিহাসকে কেন্দ্র করে, ইতিহাসের লড়াই, ইতিহাসের প্রয়োজনে ঐতিহাসিক কারনে।মতবাদের দ্বন্দে ইতিহাসের পার্থক্য হয়। আইডলজির পার্থক্যেই যুদ্ধ সংঘটিত হয়। আর যুদ্ধের জন্যই ইতিহাস রচিত হয়। কারন যুদ্ধ নিয়ে আসে পরিবর্তন আর সংস্কার। আর সংস্কারের পথেই শুরু হয় ইতিহাসের নতুন যাত্রা। এক নতুন অধ্যায়।
তেমনি ইতিহাসে, রুশ বিপ্লব এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা করে যার নাম কমিউনিজম। এরপরের ইতিহাস, কমিউনিজম বনাম গনতন্ত্রের। ইসমামবাদ বনাম কমিউজিমের। গনতন্ত্র বনাম কমিউনিজম বনাম ইসলামবাদের। অথবা, বিভক্ত ইসলামবাদ ও নেশনালিজম, পপুলিজমের সাথে কমিউনিজম ও গনতন্ত্রের দ্বন্দ। রাষ্ট্রায়ত্ত অর্থনীতির সাথে গনতান্ত্রিক মুক্ত বাজার অর্থনীতির দ্বন্দের।
১৯১৭ সালের রুশ বিপ্লব কতিপয় কিছু পর্যায়ক্রমিক ঘটনার সামষ্টিক ফল। ১৯১৪-১৯১৭ সাল পর্যন্ত রাশিয়া মিত্র শক্তির হয়ে ওসমানিয়া,জার্মানি,অস্ট্রিয়া-হাঙ্গেরি সাম্রাজ্যের বিরুদ্ধে প্রথম বিশ্বযুদ্ধে অংশগ্রহন করে।
প্রথম লক্ষ্য- বিশ্ব শাসনে প্রতিষ্ঠিত সেসকল সাম্রাজ্যকে ভেঙ্গে টুকরো টুকরো করে নিজেদের শাসন কায়েম করা।
দ্বিতীয় লক্ষ্য- বিশ্বাঙ্গনে নিজেদের পরাশক্তি হিসেবে জাহির করা বা অন্তত পরাশক্তি জোটের অন্তর্ভুক্ত হওয়া।
তৃতীয় লক্ষ্য- সাম্রাজ্যবাদী ব্রিটেন ও নব্য উদিয়মান মার্কিনি শক্তির বিপরীতে নতুন এক আইডলজি ও বিশ্বব্যবস্থা স্থাপন করা। পশ্চিমা আইডলজি ও অর্থনৈতিক ব্যবস্থা পরিত্যাগ করে রাষ্টায়ত্ত্ব কমিউনিস্ট নীতি বলবৎ করা।
সেই থেকে বৈশ্বিক রাজনীতির অঙ্গনে আগাম স্নায়ুযুদ্ধের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপিত হয়। এরপরের ইতিহাস সাম্রাজ্য বিস্তারে রক্তক্ষয়ী আগ্রাসন ও হত্যা-লুন্ঠনের। জাতিগত ও আদর্শগত সুপেরিয়রিটি প্রতিস্থাপনের এ অসম লড়াইতে ধ্বংস হয় বহু দেশ, বহু সমৃদ্ধ জাতি। যেমনটা আমরা পরবর্তীতে দেখব ইসলামের বিরুদ্ধে কমিউনিজমের যুদ্ধে ; আফগানিস্তানে সোভিয়েত আগ্রাসনের ভয়ংকর প্রতিরূপ। আমরা দেখব কিভাবে ‘প্রক্সি ওয়ারে’ জড়িয়ে যায় মার্কিন-সোভিয়েত ইউনিয়ন ও আফগানিস্তানকে বানায় তাদের নিউক্লিয়ার শক্তি পরীক্ষা নিরীক্ষা করার প্লে গ্রাউন্ড! দেখব তাদের শক্তিমত্তার লড়াইয়ের প্রাকটিস যা দিয়ে তারা মেপেছে তাদের পারমানবিক প্রজ্ঞা ও প্রযুক্তির বলবৎকরণের সঠিক হিসাব নিকাশ। অথচ, তাদের এই জটিল সমীকরণের মারপ্যাচে প্রাণ দিয়েছে লক্ষ লক্ষ নিষ্পাপ আফগানি ধর্মপ্রাণ জনগন!!
এবং পরবর্তীতে দেখব তালেবান বা সক্রিয় ইসলামিস্ট দলের উত্থান ঠেকাতে বা জঙ্গি তৎপরতা দমাতে বা টেররিজমকে কাউন্টার দিতে যে প্রক্সি ওয়ার তা আসলে ছিল, আফগানিস্থানের মাটিতে লুকায়িত লিথিয়াম খনিজ, পেট্রোলিয়াম ও তেলসম্পদ দখল করার লিপ্সা, যে লিপ্সার ক্ষুদা মেটাতে আফগানি মাটি হতে খোদ সাম্রাজ্যবাদী আগ্রাসী শক্তির দন্ত সমূলে উৎপাটিত হয়েছে এবং পরাজয় বরণ করে পশ্চাদপদ হয়েছে কোনো উল্লেখযোগ্য অর্জন ছাড়াই!উলটো পতন হয়েছে তাদের দখলে থাকা সাম্রাজ্যের, হারাতে হয়েছে সৈন্য ও যোজন যোজন অর্থের হয়েছে অযথা অপচয় এবং পরিণত হয়েছে মিলিয়ন মিলিয়ন ডলার ঋণে দুর্দশাগ্রস্ত একটি বিভক্ত জাতিতে।
যা তারা পুষিয়ে নিতে উস্কে দিচ্ছে আরো প্রক্সি ওয়ার, বিভিন্ন দেশগুলোর মধ্যে বিশেষ করে তারা টার্গেট করেছে আরব ভূমি এবং সমগ্র মধ্যপ্রাচ্যকে! এবং, মুসলিম দেশগুলোকে। বাদ যায় নি দরিদ্র খনিজ সম্পদ সমৃদ্ধ লাটিন আমেরিকা ও আফ্রিকা মহাদেশও।
তাদের ধর্মীয় বিভেদকে জাগিয়ে তুলে এবং আধিপত্য বিস্তারের নোংরা খেলায় মত্ত করে, আরব একতাকে বিনাশ করার যে স্ট্রাটেজি তারা অবলম্বন করেছে, তাতে তাদের ঝোলায় ফায়দা হিসেবে আসছে- অস্ত্র ব্যবসার অর্থ এবং স্বল্প মূল্যে পেট্রোলিয়াম পাচার ও উত্তোলন। সেই সাথে, আরব বিশ্বে টেররিজম উৎখাতের নামে তারা স্থাপন করছে সামরিক ঘাঁটি যাতে যেকোনো সময়ে যুদ্ধে জড়িয়ে তারা লভে নিতে পারে সে খনিজ সম্পদগুলো ও যাতে করে তারা শত্রু দেশগুলোর উপর নির্বিচ্ছিন্ন পাহারাদারি করতে পারে।
সেই সাথে লুফে নিচ্ছে সমুদ্র পথ ও তার অন্তর্গত সম্পদের একচ্ছত্র অধিকার যাতে সমুদ্র রুটে তারা নিয়ন্ত্রন করতে পারে তেলের ব্যবসা, বিনিয়োগ ও যুদ্ধ জাহাযের আনাগোনা। প্রক্সি ওয়ারের থ্রেট হিসেবে সমুদ্র পথেই যুদ্ধবাজ নৌ তরণীর মহড়া বা প্রদর্শন করাতো যেন বিশ্বমোড়লের জন্য নিত্তনৈমিত্তিক রুটিন!
আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থায় উন্নত ‘এস ৪০০’ ও ড্রোনের সফল বাস্তবায়ন এবং সেটেলাইট ও গোপন চিপের মাধ্যমে, তারা নিয়ন্ত্রন করছে পুরো বিশ্বব্যবস্থা। গঠন করেছে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থা বা ঐক্যজোট। সেই সাথে ত আছে তাদের সুদক্ষ ইন্টেলিজেন্স যা দিয়ে তারা নেমেছে পুরো বিশ্বে একনায়কত্ব প্রতিষ্ঠা করার গোপন মিশনে! এবং অনেক ক্ষেত্রেই তারা সফল।
যখনি তারা বুঝতে পারে, কোনো দেশ বা জাতি নেশনালিস্ট হয়ে উঠছে অথবা সমৃদ্ধ হয়ে উঠছে তখনি নানান কোয়ালিশন গঠন করে থামিয়ে দেয়া হয় সেদেশের অগ্রযাত্রা। আকাশ, জলসীমায় নানান অবরোধ চাপিয়ে, মুক্ত বাজার অর্থনৈতিক ব্যবস্থায় নানান অসম চুক্তি ও ঋণের বোঝায় জর্জরিত করে অথবা অবরোধ দিয়ে, পার্শ্ববর্তী দেশগুলোর সাথে সীমান্তের সমস্যা উস্কে দিয়ে অথবা অভ্যন্তরীণ অসন্তোষকে কাজে লাগিয়ে সরকার পতনের পায়তারা করে বা ক্যু অথবা সরল বাংলায় বললে, অভ্যুত্থান ঘটিয়ে ক্ষমতার রদবদল ঘটায় তারা এবং সেই মসনদে বসায় তাদের আইডলজির ধারক বা সংরক্ষক শক্তিকে! সেই সংরক্ষক শক্তি দেশের উন্নোয়নের নামে বিকিয়ে দেয় দেশের সম্পদকে পরাশক্তিগুলোর হাতে এবং কাঠের পুতুল হয়ে দেশ শাসন করতে থাকে যাকে আমরা ‘পুতুল সরকার’ বলি যার সুতো থাকে ‘মাস্টারমাইন্ড’ পরাশক্তিগুলোর হাতে।
সেই সাথে যাতে তাদের স্বার্থে আঘাত না লাগে সেজন্য চালু হয় সম আইডলিজির ব্যাপক প্রচার ও প্রসার যাতে দলে দলে লোকজন ন্যাশনাইজড না হয়ে যেন গ্লোবালাইজড হয়। গ্লোবালাইজড হয়ে ধরা দেয় ‘ব্রেইন ড্রেন’ এর গেমে এবং তাদের এজেন্ট হয়ে যেন সফল করে তাদের হাতে আঁকা ছকের নিঁখুত পরিকল্পনা। কেন্দ্রীয়করণ করা হয় বৈশ্বিক মিড়িয়া, শিক্ষাব্যবস্থা ও আর্থ- সামাজিক স্ট্রাকচার বা অবকাঠামোকে।
আর যারাই এর বিরুদ্ধে কথা বলবে তাদের গুম, হত্যা আর জেলের অভ্যন্তরে পুরে রাখবে। যেমন মিশরের জনগনের ভোটে নির্বাচিত প্রেসিডেন্ট ‘মুরসী’ এর বেলায় আমরা দেখেছি, কিভাবে নিজ দেশের পার্লামেন্ট দিয়ে তাকে ফাঁসির কাষ্ঠে ঝুলানো হয়, ন্যায়পরায়ণতার খেসারত দিতে হয় বেইনসাফির মৃত্যু দিয়ে!
আদতে, সবকিছুর কলকাঠি নাড়াচ্ছে এই বিশ্বমড়ল। যার উত্তপ্ত নিঃশ্বাসে পুড়ে যাচ্ছে আপামর জনসাধারণ।
এর থেকে বের হবার উপায়?!
দার্শনিক পেরেস্ত্রইকাকে (কল্পিত) জিগ্যেস করলে উত্তর দেন, “মুড়ি খাও।”
উত্তরে মুরিদ বলেন, আমরা খাব মুড়ি তারা খাবে বাসমতি?!
দার্শনিক বলেন,” আমাদের পেট বাঁসমতি হজম করতে পারে না, আমরা বাঁশ হজম করা জাতি।”
লেখিকাঃ ফারহীন ন্যান্সি।
সমাজবিজ্ঞান বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।
