![]() |
| কোরিয়ার বিভক্তিঃ স্নায়ুযুদ্ধের সূত্রপাত এবং অন্যান্য। |
সোভিয়েত ইউনিয়ন ছিল বিশ্বের সবচেয়ে বড় পরাশক্তি! আয়তনে, সৈন্যে, মিসাইলে, ব্যালিস্টিক যানে, যুদ্ধজাহাযে, অস্ত্রে সস্ত্রে অনন্য! । ঐ সময়ে সোভিয়েত ইউনিয়নে সৈন্যদের জন্য বরাদ্দ থাকত ৩০০ বিলিয়ন ডলারের উপরে। সর্বোচ্চ ৫৪ লাখের অধিক সৈন্য ছিল তাদের কাছে অথচ বর্তমানে সবচেয়ে শক্তিশালী চীনের কাছে সৈন্য আছে মাত্র ২০ লাখ। আমেরিকা ও রাশিয়ার কাছে সৈন্য আছে যথাক্রমে ১৪ লাখ ও ১০ লাখ। তাহলে, বুঝাই যাচ্ছে এলাহি কান্ড ছিল তখনকার সোভিয়েত ইউনিয়ন! সোভিয়েত সেনাবাহিনিতে ট্যাংক ছিল ৫৫ হাজার৷ এত সংখ্যক ট্যাংক যা বর্তমানে কোনো দেশের নেই।
আজও যদি সোভিয়েত ইউনিয়ন টিকে থাকত তবে বিশ্ব রাজনীতি কেমন হতো?!
আর তাইতো, নিরঙ্কুশ ক্ষমতাবলে সোভিয়েত ইউনিয়ন দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ, কোরীয় যুদ্ধ, ভিয়েতনামের যুদ্ধ ও আফগানিস্তানের যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেছিল।
মুলত সোভিয়েত ইউনিয়নের অপ্রতিরোধ্য সেনাবাহিনীর কাছে হার মেনেছিল হিটলার বাহিনী। যদি সোভিয়েত ইউনিয়ন দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে অংশগ্রহণ না করত তবে হিটলারের নাৎসি বাহিনী কখনও পরাজিত হত না।
কিন্তু সামরিক আগ্রাসনের লিপ্সায় উন্মাদ সোভিয়েত ইউনিয়ন,দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শেষ হতে না হতে কোরিয় যুদ্ধে অংশ নিয়েছিল।একই অবস্থা ভিয়েতনাম যুদ্ধেও। এরপর, দীর্ঘকাল চলে সোভিয়েত ইউনিয়ন বনাম আমেরিকার স্নায়ুযুদ্ধ। সবাই তখন অপেক্ষায় ছিল, আমেরিকার সাথে সোভিয়েত ইউনিয়নের একটা পারমানবিক যুদ্ধ হবে, আর সেই থেকে তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধের সুত্রপাত হবে।
কিন্তু সকল জল্পনা কল্পনা শেষে সে যুদ্ধ বাধে আফগানিস্তানের সাথে খনিজ সম্পদ দখল করার জন্যে। কিন্তু, দীর্ঘ দশ বছরের যুদ্ধে পরাস্ত হয়ে ভেঙ্গে পড়ে স্বয়ং সোভিয়েত ইউনিয়ন!
কিন্তু, কোরিয়াকে দখল করা নিয়ে কেন যুক্তরাষ্ট্রের সাথে সোভিয়েত ইউনিয়নের দ্বন্দ শুরু হয়?!
কেনইবা কোনো পরাশক্তিই কোরিয়াকে ছাড়তে চাইল না, আর উভয়ে মিলে ভাগাভাগি করে নিল এই অঞ্চলকে? তা জানার আগে, আমাদের কোরিয়ার ইতিহাস সম্পর্কে কিছুটা ধারণা পেতে হবে।
পূর্বের কোরিয়া উপদ্বীপে ছোট ছোট অনেক সাম্রাজ্য ছিল এবং ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র অঞ্চলের অনেক গুলো শাসক ও রাজবংশ ছিলো। কিন্তু, একসময় সেই সাম্রাজ্য একটি শাসকের অধীনে আসে,সে সাম্রাজ্যের নাম ছিল জশোয়াইন সাম্রাজ্য! যেটা প্রায় ৫০০ বছর ধরে সমগ্র কোরিয়া শাসন করেছিল।১৩৯২ সালে প্রতিষ্ঠিত হওয়া এ সাম্রাজ্যের প্রতিষ্ঠাতা ছিলেন ই শিয়েন নামক শাসক। ১৫৯০ সালে জাপান আক্রমণ করেছিল এই সাম্রাজ্যকে এবং মাঞ্চুরিয়াও এই অঞ্চলকে আক্রমণ করেছিল ১৬২৭ সালে।
মাঞ্চুরিয়া বর্তমানে চীনের অন্তর্ভুক্ত হলেও, চীনের ঐ অংশ শাসন করত তখন মাঞ্চু নামক সাম্রাজ্য। জাপান এবং মাঞ্চুরিয়ার আক্রমণে এ সাম্রাজ্য দুর্বল হয়ে পড়েছিল। একপর্যায়ে ১৮৯৭ সালে এ সাম্রাজ্যের পতন হয় এবং একটি নতুন সাম্রাজ্য স্থাপিত হয় যার নাম ছিল কোরিয়ান সাম্রাজ্য যার প্রতিষ্ঠাতা ছিল গু জং।
কোরীয় সাম্রাজ্যের পতন হয়েছিল ১৯১০ সালে জাপানের আক্রমণে।
জাপান ১৯১০ সালে কোরিয়া দখল করে নিয়েছিল। এর আগে জাপানের সাথে চীন ও রাশিয়ার যুদ্ধ হয়েছিল।কারন চীনের সাথে কোরিয়ার অনেক বড় সীমান্ত আছে এবং রাশিয়ার সাথেও কোরিয়ার ১৭-১৮ কিলোমিটারের সীমান্ত আছে। সেজন্য চীন ও রাশিয়া কখনও মেনে নিতে পারত না যে জাপান এত দূরের দেশ হবার পরেও কোরিয়া দখল করে নিবে।
যার ফলে কোরিয়ার উপর আধিপত্য স্থাপন করা নিয়ে জাপানের সাথে চীন ও রাশিয়ার যুদ্ধ হয়েছিল।
চীনের সাথে জাপানের যুদ্ধ হয়েছিল ১৮৯৪-১৮৯৫ সালে।
এই যুদ্ধে চীন হেরেছিল এবং জাপানের প্রভাব বৃদ্ধি পেয়েছিল কোরিয়ান উপদ্বীপ অঞ্চলে। আর রাশিয়ার সাথে জাপানের যুদ্ধ হয়েছিল ১৯০৪-১৯০৫ সালে। এই যুদ্ধে বিশাল বড় সোভিয়েত ইউনিয়ন হেরে গিয়েছিল ক্ষুদ্র জাপানের কাছে! যার ফলে জাপান ১৯১০ সালের মধ্যে সম্পূর্ণ কোরিয়া দখল করে নেয়। জাপান কোরিয়াকে ১৯১০-১৯৪৫ সাল পর্যন্ত শাসন করে৷
এই সময়ের কোরিয়ার বড় বড় নেতারা চীনে চলে যায় এবং সেখানে প্রবাসী সরকার গঠন করে। তারা, একটি সংবিধান প্রণয়ন করেছিল এবং সেই সংবিধানে কোরিয়ার নাম দিয়েছিল ‘ রিপাকলিক অফ কোরিয়া’। ১৯১৯ সালে এ প্রবাসী সরকার গঠিত হয়।
এরপর, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শুরু হয়। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে দুটি দল ছিল।অক্ষ শক্তি ও মিত্র শক্তি। অক্ষ শক্তির অন্তর্ভুক্ত ছিল- জার্মানি, ইতালি, জাপান। মিত্রশক্তিতে ছিল তৎকালীন বড় বড় দেশগুলো- যুক্তরাজ্য, যুক্তরাষ্ট্র, সোভিয়েত ইউনিয়ন ও চীন।
১৯৪৫ সালের জুলাই মাসে জার্মানিতে একটা কনফারেন্সের আয়োজন করা হল। মিত্রশক্তির দেশগুলো সে কনফারেন্সের আয়োজন করে। কারন, জার্মানি ততদিনে আত্মসমর্পণ করেছে। হিটলার আত্মহত্যা করেছে ও জার্মানি মিত্রপক্ষের অধীনে চলে আসে আর জার্মানিকে দু ভাগ করা হয়েছে। তারা জার্মানিতে একত্রিত হয়ে সোভিয়েত ইউনিয়নকে পরামর্শ দিল জাপানে আক্রমণ করতে। কারন, আমরা জানি সোভিয়েত ইউনিয়ন দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে অনেক পরে এসে যোগ দিয়েছিল।তাই, এবার তারা সোভিয়েত ইউনিয়নকে শত্রু অঞ্চলে হানা দিতে বলে।
সোভিয়েত ইউনিয়ন কোরিয়ায়ে আক্রমণ করতে চেয়েছিল। কারন কোরিয়াতে তখন জাপানি শাসন চলছে আর কোরিয়াকেও জাপানি শাসন থেকে মুক্ত করে তাদের আয়ত্ত্বাধীন আনতে হবে। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্র বাধ সাধল কারন যুক্তরাষ্ট্র শঙ্কায় ছিল যে কোরিয়া হল চীন ও রাশিয়ার একদম নাকের ডগায়। এখান থেকে যদি জাপানি শাসন উঠে যায় তবে রাশিয়া সহজেই কোরিয়া দখল করে ফেলতে পারবে।
তারা প্রতিজ্ঞা করেছিল যে কোরিয়ার জাপানি শাসনের অবসান ঘটিয়ে, তারা কোরিয়াকে একটি স্বাধীন দেশ হিসেবে স্বীকৃতি দিবে।
এতে, বুঝা যাচ্ছে যে ভূচিত্রে কোনো দেশ স্বাধীন হওয়া মানে তা কোনো না কোনো পরাশক্তির অঙ্গুলি হেলনে হওয়া, তাদের মন মর্জিমত। যেখান হতে তারা সাহায্যের নামে অথবা স্বীকৃতি দেয়ার নামে পরোক্ষভাবে কর্তৃত্ব ধরে রাখে। সেদেশের আভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে সাহায্য, স্বীকৃতি ও প্রতিরক্ষা দেয়ার নামে হস্তক্ষেপ করা এবং সীমান্ত দিয়ে অবাধে বাণিজ্য সুবিধাদি নেয়া, অবকাঠামোগত উন্নোয়ন এর নামে সেদেশকে ঋনগ্রস্ত করে মুনাফা হাতানো সহ, বিনিয়োগের নামে নিজেদের কর্মসংস্থান বিস্তার করা ও বাণিজ্য রুট স্থাপন করা তাদের লক্ষ্য। অথচ তারা সেদেশের যোগাযোগ ব্যবস্থা উন্নত করে, নিজেদেরই ব্যবসা বাণিজ্যের প্রসারের জন্য যাতে করে নির্বিঘ্নে তারা যেকোনো রুটে যেকোনো জায়গায় সেনা মোতায়েন করতে পারে, পণ্য সরবরাহ সহ, শুল্ক মুক্ত অথবা কম শুল্কে বাণিজ্য করতে পারে ও সেসব তৈরিকৃত বন্দর, রাস্তা বা সেতুতে সংগৃহীত টোলের মাধ্যমে মুনাফা গুনতে পারে অথবা কিয়দংশে ভাগ বসাতে পারে!
তো, এইভাবেই যুদ্ধ চলছিল আর এক পর্যায়ে যুক্তরাষ্ট্র জাপানের হিরোশিমায় ৬ই আগষ্ট বোমাবর্ষণ করল। আর এর দুই দিন পর ৮ই আগষ্ট সোভিয়েত ইউনিয়ন জাপানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করে দিল। এবং সোভিয়েত ইউনিয়নের সৈন্য কোরিয়ায় ঢুকে গেল।তারা, কোরিয়া ও মাঞ্চুরিয়ায় যে জাপানি শাসন কায়েম ছিল তার বিরুদ্ধে যুদ্ধ শুরু করে দিল।
এখন সোভিয়েত ইউনিয়নের সৈন্য যখন প্রবেশ করল তখন যুক্তরাষ্ট্রের কপালে চিন্তনরেখার ভাঁজ পড়ল।কারন, যুক্তরাষ্ট্রের মনে সবসময় একটা ভয় ছিল যে এত বড় কোরিয়া উপদ্বীপ, যেটি অনাবিল সৌন্দর্য ও লুকানো সম্পদে ভরপুর একটি দেশ, তা খুব সহযেই রাশিয়া দখল করে ফেলতে পারে।
তাই, যুক্তরাষ্ট্র তড়িঘড়ি করে দুজন সেনাকর্মকর্তা পাঠাল কোরিয়ায় এবং নির্দেশ দিল কোরিয়া উপদ্বীপ দুভাগ করতে। যুক্তরাষ্ট্রের এই দুজন উর্ধ্বতন কর্মকতা ৩৮° অক্ষরেখা বরাবর কোরিয়াকে দু ভাগ করে ফেলল নানান সভা মিটিং কমিটি গঠন করার পর, বিভিন্ন তৎপরতা চালিয়ে। সিদ্ধান্ত নেয়া হলো যে উত্তত দিকের সৈন্যরা আত্মসমর্পণ করবে সোভিয়েত ইউনিয়নের কাছে আর দক্ষিন দিকের সৈন্যরা আত্মসমর্পণ করবে যুক্তরাষ্ট্রের কাছে।
যুক্তরাষ্ট্র ৮ই সেপ্টেম্বর দক্ষিন দিক দিয়ে কোরিয়ায় ঢুকে এবং সেদিন দক্ষিনের সৈন্যরা আমেরিকান সৈন্যদের কাছে আত্মসমর্পণ করে। অন্যদিকে উত্তর দিকের সৈন্যরা সোভিয়েত ইউনিয়নের কাছে আত্মসমর্পন করে। যুক্তরাষ্ট্র বৈশ্বিক রাজনীতির অঙ্গনে কোরিয়া উপদ্বীপের এ বিভক্তিকরণ নিয়ে যুক্তি দেখায় যে, তারা জাপানকে কোনঠাসা করার জন্যে সামরিক শক্তিমত্তা জাহির করবার জন্য, এ সিদ্ধান্ত গ্রহন করে।যাতে দুদিকে দুই পরাশক্তির সেনাদের চাপে জাপানিরা ভীতসন্ত্রস্ত হয়ে সহযে আত্মসমর্পণ করে৷ কিন্তু, আদতে এটি যে শুধুমাত্র আইওয়াশ ছিল বা নিছক যুক্তি ছিল তা সকলেই অচিরে বুঝতে পারে। প্রকৃতপক্ষে, তারা চেয়েছিল রাশিয়া ও চীনের নাগালে থাকা কোরিয়াতে যেন তাদের আধিপত্য স্থাপিত হয় এবং মিত্র শক্তির সদস্য দেেশ হবার দরুন তারা পরাজিত দেশের কর্তৃত্ব ছাড়তে নারাজ৷
অন্যদিকে জাপানি শাসন শেষ হয়ে যাবার দরুন কোরিয়ান শাসকরা অনিশ্চিয়তায় পড়ে যায়। কি করবে তা তারা বুঝে উঠতে পারছিল না। দক্ষিন দিকের নেতারা ঠিক করল তারা স্বায়ত্তশাসন অর্জন করবে।উত্তর ও দক্ষিন দিক; উভয় অংশ নিয়ে একটি স্বাধীন সার্বভৌম দেশ গঠিন করবে। এর প্রস্তুতির অংশ হিসেবে তার ১৬ আগষ্ট, ১৯৪৫ সালে তারা একটি কমিটি গঠন করল। এবং, ৬ সেপ্টেম্বর তারা একটি ন্যাশনাল এসেম্বলির আয়োজন করল এবং সেদেশটির নাম দিল ‘ দ্যা পিপলস রিপাকলিক অফ
কোরিয়া’।
কিন্তু, কার্যত কোরিয়ার দু অংশে দু দেশের রাজনৈতিক আদর্শে বিভক্ত ছিল। আর দক্ষিন দিকের কোরিয়ায় মার্কিনি যে সামরিক সরকার ছিল তারা নতুন গঠিত সরকারকে স্বীকৃতি দেয় নি। তারা বলল যে, তারাই এ অঞ্চলের একমাত্র বৈধ সরকার।
অন্যদিকে কোরিয়াতে জাপানি আক্রমণ চলাকালীন সময়ে চীনে একটি প্রবাসী সরকার গঠিত হয়েছিল, যারা ক্ষমতায় ছিলেন ১৯১৯ সাল থেকে, তারা কোরিয়ায় পালিয়ে এসে যখন আবার সরকার গঠন করল, তাবেদার মিলিটারি সরকার সেই সরকারকেও প্রত্যাখান করল। তারা, তাদের একটা পলিটিক্যাল পার্টি হিসেবে আত্মপ্রকাশ করতে বলল। যুক্তরাষ্ট্র একপর্যায়ে বলল আমরা মিত্র শক্তির দেশগুলো মিলে পাঁচ বছরের জন্য একটি ট্রাস্টিশিপ গঠন করে দেব। এবং, পাঁচ বছর পর দেশটিকে স্বাধীনতা দিয়ে দিব। কিন্তু, কোরিয়ার নাগরিক এই প্রস্তাবকে নাকচ করে দিল এবং তারা তৎক্ষণাৎ স্বাধীনতা চাইল। কারন, তারা আশঙ্কা করেছিল যে মার্কিনিরাও জাপানিদের মত তাদের শাসন করবে বছরের পর বছর ,তারা এত সহযে ক্ষমতা ছাড়বে না।
পরিস্থিতি যখন বেসামাল, যুক্তরাষ্ট্র তখন বুঝতে পারল যে ‘ট্রাস্টিশিপের শিরনী’ কোরিয়ানদের গেলানো যাবে না! তখন সে ভাবল তার মতাদর্শের আরেকটি দেশ পৃথিবীর বুকে গঠন করতে পারলে, অর্থাৎ পুঁজিবাদী দেশ হিসেবে কোরিয়াকে স্বীকৃতি দিতে পারলে, সমাজতন্ত্রের সোভিয়েত ইউনিয়নের সাথে ক্ষমতার দ্বন্দে তারা একধাপ এগিয়ে যাবে। তাহলে, তার অনুসারী আরেকটা দেশের সংখ্যা পৃথিবীর মানচিত্র জায়গা করে নিবে। আরেকটা, পুঁজিবাদী দেশের সংখ্যা বাড়বে।
সেজন্যে সে তার দখলে থাকা দক্ষিন ভাগে একটা উপদেষ্টা পরিষদ গঠন করল যার চেয়ারম্যান বানালো শিং ম্যান রি কে, যিনি ছিলেন কোরিয়ায় চীনা প্রবাসী সরকারের একজন প্রেসিডেন্ট। তাকে কোরিয়ার যুক্তরাষ্ট্রের মিলিটারি সরকারের উপদেষ্টা পরিষদের চেয়ারম্যান বানানো হল। আর, পর্যায়ক্রমে, সেবছর অক্টোবরে একটি ‘ ইন্টেরিম ল্যাজিসলেটিভ এসেম্বলি’ গঠন করল। এতে করে যুক্তরাষ্ট্র নিশ্চিত হতে পারল যে দক্ষিন দিকে, তারা একটি পুঁজিবাদী সরকার গঠন করতে সক্ষম হবে।
উত্তর দিক যেহেতু ছিল সোভিয়েত ইউনিয়নের অংশ আর যেহেতু সোভিয়েত ইউনিয়ন ছিল সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্র। তাই,এই উত্তরাংশে সোভিয়েত ইউনিয়ন কোনো মিলিটারি সরকার গঠন করে নি কিন্তু সেদেশের বিদ্যমান প্রদেশগুলোতে যে বামপন্থী নেতা ছিল তাদের নিয়ে একটি কমিটি গঠন করল।
একপর্যায়ে এসে ১৯৪৬ সালে এসে ‘দ্যা প্রভিশনাল পিপলস কমিটি অফ নর্থ কোরিয়া’ নামক কেন্দ্রীয় কমিটি গঠন করল। অর্থাৎ, এই কমিটিটাই সরকারের মত কাজ করত। এবং, এই কমিটি গঠন করার আগে সে কিম ইল সাং নামের একজন উত্তর কোরীয় কমিউনিস্ট নেতাকে হাজির করল জনসাধারণের সম্মুখে৷ কিম ইল সাং এর মতাদর্শ জনপ্রিয়তা লাভ করতে থাকে।
এরপরে, কিম ইল সাং কে নর্থ কোরিয়ার কমিউনিস্ট পার্টির সেক্রেটারি হিসেবে নিযুক্ত করা হলো। এবং, ১৯৪৭ সালে ‘সুপ্রিম পিপলস এসেম্বলি’ নামে একটি কমিটি গঠন করা হলো অর্থাৎ ধীরে ধীরে সোভিয়েত ইউনিয়নও উত্তরদিকে একটি বামপন্থী সরকার গঠনের প্রস্তুতি নিচ্ছিল।
এদিকে ১৯৪৭ সালের সেপ্টেম্বরে, যুক্তরাষ্ট্র কোরিয়ার স্বাধীনতার বিষয়টি জাতিসংঘে উপস্থাপন করে। জাতিসংঘে বলা হলো সমগ্র কোরিয়াতে একটা জাতীয় নির্বাচন হবে৷ সেই নির্বাচনে সংখ্যাগরিষ্ঠ দলটি সরকার গঠন করবে এবং উক্ত সরকারের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তর করে দেশ ত্যাগ করবে উভয়ই-মার্কিন ও সোভিয়েতরা।
কিন্তু সোভিয়েত ইউনিয়ন জাতিসংঘের সে প্রস্তাব অস্বীকার করল। জাতিসংঘের যে কমিশন প্রেরিত হয়েছিল যার তত্ত্বাবধানে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে তাকে তারা উত্তর দিকে প্রবেশ করতে দিল না।
যার ফলে দক্ষিন দিকে নির্বাচন হলো জাতিসংঘের অধীনে, ১০ ই মে ১৯৪৮ সালে। সেদিন ন্যাশনাল এসেম্বলি গঠন করা হলো, ও সিং ম্যান রি প্রথম প্রেসিডেন্ট হিসেবে নির্বাচিত হলেন। আর,সেবছরের ১৫ ই আগষ্টে দক্ষিন কোরিয়া ‘দা রিপাকলিক অফ কোরিয়া’ নামে আত্মপ্রকাশ করল।এর রাজধানী হয় শিউল এবং যুক্তরাষ্ট্রের যে মিলিটারি সরকার ছিল তা কোরিয়ার নতুন গঠিত সরকারের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তর করে দেশ ত্যাগ করে।
আর সেবছর ডিসেম্বরে, জাতিসংঘ ঘোষণা দিল জাতিসংঘের অধীনে যে নির্বাচন সংগঠিত হয়েছে সে নির্বাচনে জয়ী সরকার পুরো কোরিয়ার সরকারপ্রধান হবে। কিন্তু, উত্তর কোরিয়ার যে সরকার, তারা এ ঘোষণাকে মেনে নিল না এবং দক্ষিন কোরিয়ায় গঠিত সরকারকে স্বীকৃতি দিল না।
অন্যদিকে, উত্তর কোরিয়ায় সোভিয়েত ইউনিয়নের অধীনে ১৯৪৮ সালের নভেম্বরের দিকে একটি সংবিধান প্রণয়ন করা হলো এবং সে সংবিধানের অধীনে নির্বাচন হলো। এবং, কিম ইল সাং হলেন প্রথম প্রিমিয়ার৷ অর্থাৎ, দেশের প্রথম সর্বোচ্চ নেতা এবং উত্তর কোরিয়ার সাংবিধানিক নাম রাখা হলো ‘ দি ডেমোক্রেটিক পিপলস রিপাকলিক অফ কোরিয়া ‘ এবং উত্তর কোরিয়ার রাজধানী করা হলো পিয়ং ইয়ং। এবং, সোভিয়েত ইউনিয়ন উত্তর কোরিয়ার সরকারকে সমগ্র কোরিয়ার একমাত্র নির্বাচিত সরকার বলে ঘোষণা দিল। তাহলে, বুঝাই যাচ্ছে সংকট আসন্ন!
এরপরের, ঘটনাচক্র মোড় নিবে রক্তক্ষয়ী যুদ্ধে।১৯৫০-১৯৫৩ সাল পর্যন্ত স্থায়ী হবে সে যুদ্ধ এবং চিরস্থায়ীভাবে উত্তর ও দক্ষিন কোরিয়ার মধ্যে নেমে আসবে চিরবৈরিতা! সমস্ত বন্ধন, যোগাযোগ ছিন্ন করে দেওয়া হবে এবং তারা পরিণত হবে একে অপরের সবচেয়ে বড় শত্রুতে।
এভাবেই, কোরিয়া বিভক্তি নিয়ে তথা প্রাচ্যে আধিপত্য স্থাপন করা নিয়ে সূচনা হয় স্নায়ুযুদ্ধের শীতলতা দুই পরাশক্তিঃ সোভিয়েত ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে! যা পরে গড়াবে, ভিয়েতনাম ও আফগানিস্তান যুদ্ধের ময়দান অবধি!
লেখিকাঃ ফারহীন ন্যান্সি।
সমাজবিজ্ঞান বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।
